বাংলাস্ফিয়ারঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে অবসরের পরে থাকার বৈধতা নিয়ে বিরোধ থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বাসিন্দাকে জোর করে সরানো যাবে না। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের মামলায় এই সীমারেখা স্পষ্ট করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। রায়টি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর; আইনসংবাদে প্রকাশিত হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। এটি ২২ সেপ্টেম্বরের নতুন রায় নয়। তবু সরকারি প্রতিষ্ঠানের আবাসন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর অধিকারের প্রশ্নে সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ।

তপন পান্ডা ও অন্যদের দায়ের করা আপিলে বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সন্দীপ কুমার দে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নোটিস পরীক্ষা করেন। ১০ জুনের ওই নোটিসে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের কোয়ার্টার ছাড়তে বলা হয়েছিল। তা না-করলে জেলা পুলিশের সাহায্যে অননুমোদিত দখলকারীদের জোর করে উচ্ছেদের উপযুক্ত প্রক্রিয়া শুরু করার কথা লেখা ছিল। নোটিসের এই ভাষাই আবেদনকারীদের আশঙ্কার কেন্দ্রে ছিল।

তাঁদের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বলপ্রয়োগ করা হতে পারে। সেই কারণে তাঁরা অন্তর্বর্তী সুরক্ষা চেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য ছিল আলাদা: নোটিসের উদ্দেশ্য কেবল নিয়মমাফিক উচ্ছেদ-প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানানো, আইন পাশ কাটানো নয়। আদালত এই বক্তব্য এবং নোটিসের ভাষা পাশাপাশি বিবেচনা করে ব্যাখ্যা দিয়েছে।

ডিভিশন বেঞ্চের মতে, নোটিসটি মূলত সম্ভাব্য উচ্ছেদ-প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী পদক্ষেপ। কিন্তু উপযুক্ত আইনি কার্যক্রমের সঙ্গে জোরপূর্বক অপসারণ ও জেলা প্রশাসনের সাহায্যের ভাষা মেশানো কিছুটা অসংগত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবীর ব্যাখ্যা গ্রহণ করে বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, ওই নোটিসের কোনও অংশই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আবেদনকারীদের উচ্ছেদের ক্ষমতা দেয় না। পুলিশ ব্যবহার করা হলেও এই শর্ত এড়ানো যাবে না।

এই ব্যাখ্যার অর্থ অবশ্য আবেদনকারীরা কোয়ার্টারের স্থায়ী অধিকার পেয়েছেন নয়। আদালত একক বিচারপতির সংশ্লিষ্ট আদেশে হস্তক্ষেপ করেনি; পর্যবেক্ষণগুলি জানিয়ে আপিল নিষ্পত্তি করেছে। কোয়ার্টারে থাকার অধিকার এবং সেখান থেকে সরানোর পদ্ধতি পৃথক প্রশ্ন। প্রথমটির বিরোধ থাকলেই দ্বিতীয়টির নিয়ম অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। আবার দ্বিতীয়টির সুরক্ষা পেলেই প্রথমটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না।

মামলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ও ওঠে। আবেদনকারীরা তাতে দুর্ভোগের কথা জানান। কিন্তু তাঁদের যে অন্তর্বর্তী প্রার্থনা ছিল—সংযোগ যেন বিচ্ছিন্ন না-করা হয়—শুনানির সময়ে সংযোগ ইতিমধ্যেই কাটা হয়ে যাওয়ায় সেটি আর আগের আকারে কার্যকর ছিল না। বেঞ্চ তাঁদের উপযুক্ত প্রতিকার চেয়ে রিট আদালতে যাওয়ার সুযোগ রেখেছে। সেই আদালত আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনে শর্ত দিয়ে, আবেদন বিবেচনা করবে। বর্তমান রায়ে অবিলম্বে বিদ্যুৎ ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষণঃ রায়ের ব্যবহারিক গুরুত্ব এখানেই: প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি পরিচালনার প্রয়োজন এবং বাসিন্দার প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা, দুটিকেই একসঙ্গে মানতে হবে। অবসরের পরে আবাসন ধরে রাখার বিরোধ মেটাতে নিয়ম, নোটিস এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রশাসনিক চাপ দিয়ে সেই ধাপ ছোট করা হলে সম্পত্তির বৈধ দাবি থাকলেও প্রক্রিয়াটি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এই মামলায় আদালত মূলত সেই সীমাটিই চিহ্নিত করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়েরও আবাসনের প্রয়োজন থাকতে পারে—বর্তমান কর্মীদের বরাদ্দ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুরনো দখল সংক্রান্ত সমস্যা বাস্তব প্রশাসনিক বিষয়। কিন্তু কার ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য, ছাড়ার সময়সীমা কত এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ কী, তা পরিষ্কার না-হলে বিরোধ দীর্ঘ হয়। লিখিত ও সমভাবে প্রয়োগ করা নীতি প্রতিষ্ঠান এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মী উভয়ের জন্যই ভালো। একই ধরনের অবস্থায় থাকা কর্মীদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ হচ্ছে কি না, প্রকাশ্য নীতি থাকলে সেটিও পরীক্ষা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

বিদ্যুতের প্রসঙ্গ দেখায়, মামলার প্রার্থনা ও বাস্তব অবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে ব্যবধান কত গুরুত্বপূর্ণ। সংযোগ কাটার আগের নিষেধাজ্ঞা এবং কাটার পরে পুনঃসংযোগের প্রতিকার এক নয়। তাই এই রায়কে শুধু ‘কর্মীদের জয়’ বা ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়’ বলা অসম্পূর্ণ হবে। সঠিক সারকথা: উচ্ছেদের জন্য আইন মানতেই হবে, কিন্তু আবাসনের অধিকার ও বিদ্যুৎ ফেরানোর প্রশ্নে আরও পৃথক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।