উত্তরবঙ্গ সফরে একসঙ্গে চা-বাগান, পর্যটন, বিমান যোগাযোগ আর বন্যপ্রাণীর প্রসঙ্গ তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার কোচবিহার থেকে শুরু হওয়া সফরে তাঁর ঘোষণার তালিকায় রয়েছে ২০ শতাংশ পুজোর বোনাস, বন্ধ চা-বাগান খোলার উদ্যোগ, কোচবিহার বিমানবন্দরকে ‘উড়ান’ প্রকল্পে আনার পরিকল্পনা এবং বক্সায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ছাড়ার সম্ভাবনা। একই সফরে জলপাইগুড়িতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি মূর্তি নদীর সেতুও উদ্বোধন করেন তিনি।

কোচবিহারকে ধর্মীয় ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের বড় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। মদনমোহন মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর তিনি বলেন, জেলার মন্দিরের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেও পর্যটনের কেন্দ্রে আনতে হবে। তার জন্য শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, প্রয়োজন ভালো রাস্তা, রেল যোগাযোগ এবং থাকার ব্যবস্থা। মদনমোহন ছাড়াও বাণেশ্বর শিবমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, সিদ্ধনাথ শিবমন্দির ও মধুপুর সত্রকে এই পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আগামী ৯ মে ২০২৭-এর মধ্যে কোচবিহারবাসীর প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। উন্নয়নের জন্য অর্থের অভাব হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। প্রাথমিক ভাবে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্পের কথা থাকলেও সেটিকে আরও বড় উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

পর্যটনের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার অঙ্কটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোচবিহার বিমানবন্দর বর্তমানে নিয়মিত বিমান পরিষেবা ছাড়াই রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিমানবন্দরটিকে ‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ চলছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে চুক্তির সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে কিছু অমিল থাকলেও, বিমানবন্দরকে প্রকল্পটির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে।

উন্নত বিমান, রেল ও সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে ভালো অতিথিশালা ও থাকার ব্যবস্থা তৈরি হলে হোটেল, পরিবহণ, রেস্তরাঁ এবং ছোট ব্যবসার সুযোগ বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তরাই-ডুয়ার্সকে এক বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও ঘোষণা করেছেন তিনি।

এরপরই আসে চা-বাগানের প্রসঙ্গ। উত্তরবঙ্গের বন্ধ চা-বাগানগুলি ফের খোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে শুভেন্দু জানান, চা-শ্রমিকদের ২০ শতাংশ পুজোর বোনাস নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে। জমিতে বসবাসকারী চা-শ্রমিকদের মালিকানার অধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। টোটোপাড়ায় ১,২০০টি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছেন।

তবে ‘বোনাস দেওয়া হবে’ এবং শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাওয়া এক কথা নয়। বাস্তবে অন্তত একটি ডুয়ার্সের চা-বাগানে ২০ শতাংশ বোনাস ইতিমধ্যেই শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে বলে টিভি৯ বাংলার প্রতিবেদন জানিয়েছে। ফলে ঘোষণার পাশাপাশি কোন কোন বাগানে, কবে এবং কী ভাবে বাকি অর্থ পৌঁছবে—সেটিই এখন বাস্তবায়নের প্রশ্ন।

বন্যপ্রাণীও বাদ যায়নি এই সফরের তালিকা থেকে। আলিপুরদুয়ারের সুভাষিণী চা-বাগানে বিশ্ব গন্ডার দিবসের অনুষ্ঠানে একটি গন্ডার গ্যালারি উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা জানান। সম্ভাব্য সময় হিসেবে ২ অক্টোবরের কথা বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ অঞ্চলকে পর্যটনের আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য করাও এই উদ্যোগের একটি উদ্দেশ্য।

এই অংশে একটি ছোট সংশোধন জরুরি। আপনার খসড়ায় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘দুই হস্তিশাবক’ এবং ‘দুই গন্ডার’—দুই রকম তথ্য এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে অবশ্য শুভেন্দু অধিকারী সুভাষিণী চা-বাগানে দুটি গন্ডারের নাম ‘চৈতন্য’ ও ‘সুলক্ষণা’ রেখেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই যাচাইযোগ্য তথ্য হিসেবে গন্ডারের কথাই রাখা নিরাপদ।

সফরের শেষ পর্বে উন্নয়নের আরও একটি দৃশ্য—জলপাইগুড়ির মূর্তি নদীর উপর নতুন সেতু। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি, প্রায় ১২৬ মিটার লম্বা ও ১৩ মিটার চওড়া এই সেতু নাগরাকাটার সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করবে বলে প্রশাসনের বক্তব্য। আরও দু’টি সেতুর কাজ চলছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কালীখোলা সেতু পুনর্নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

এক সফরে তাই উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের একাধিক ছবি পাশাপাশি এসেছে—মন্দিরে পর্যটক, বিমানবন্দরে বিমান, চা-বাগানে শ্রমিক, জঙ্গলে বাঘ আর নদীর উপর নতুন সেতু। ঘোষণাগুলির পরবর্তী ধাপ অবশ্য বাস্তবায়ন। পর্যটনের জন্য পরিকাঠামো তৈরি, বন্ধ বাগান খোলা, বোনাস পৌঁছে দেওয়া কিংবা বক্সায় বাঘ ছাড়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত মাপা হবে কাজ কতটা এগোল, শুধু মঞ্চে কী ঘোষণা হল তা দিয়ে নয়।