বেআইনি মাটি কাটার ডাম্পার ধাওয়া করতে গিয়ে প্রাণ গেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বনকর্তার

বনভূমি থেকে বেআইনি ভাবে মাটি কাটার খবর পেয়ে অভিযানে গিয়েছিলেন। মাটি বহনকারী ডাম্পারটি পালাতে দেখে নিজের মোটরবাইকে তার পিছু নেন। অভিযোগ, তখনই ডাম্পারের সঙ্গীরা চালককে উসকানি দেয়, “ওর উপর দিয়ে চালিয়ে দে।” এর পর বনকর্তাকে পিষে দিয়ে পালায় ডাম্পার। রাজস্থানের প্রতাপগড় জেলায় সোমবার মধ্যরাতে এ ভাবেই প্রাণ হারালেন একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বনাঞ্চল আধিকারিক প্রতাপ সিংহ চুন্ডাওয়াত। বয়স হয়েছিল ৪০ বছর।

ঘটনাটি ঘটেছে ছোটিসাদড়ি থানা এলাকার ঘাটিওয়ালে বালাজি মন্দিরের কাছে একটি বনাঞ্চলে। নিজের রয়্যাল এনফিল্ড মোটরবাইকে ডাম্পারটির পিছু নিয়েছিলেন প্রতাপ।

প্রতাপগড়ের ডেপুটি পুলিশ সুপার রামেশ্বর লাল ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে বলেন, সোমবার গভীর রাতে বনকর্মীরা খবর পান, বনাঞ্চল থেকে বেআইনি ভাবে মাটি কাটা হচ্ছে। তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি জেসিবি এবং একটি ডাম্পারকে কাজ করতে দেখেন। বনকর্মীদের দেখে ডাম্পারটি পালাতে শুরু করে। প্রতাপ মোটরবাইকে সেটির পিছু নেন। অভিযোগ, পরে সেখানে পৌঁছে ডাম্পারের সঙ্গে থাকা অন্য অভিযুক্তেরা চালককে বলেন, “ওর উপর দিয়ে চালিয়ে দে।” এর পর চালক ডাম্পারটি প্রতাপের উপর দিয়ে চালিয়ে পালিয়ে যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ডাম্পারচালকের নাম কানা বাওরি। খুন, বেআইনি খনন, সরকারি কর্মীর কর্তব্যপালনে বাধা দেওয়া এবং বনভূমি থেকে চুরি-সহ একাধিক অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে।

রামেশ্বর লাল বলেন, জেসিবি এবং ডাম্পারটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। জেসিবির মালিক ও চালক-সহ কয়েক জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বেআইনি খননের খবরেই অভিযান

এফআইআর অনুযায়ী, প্রথমে তিন জন বনকর্মী ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তখন পাঁচ-ছয় জন বেআইনি ভাবে মাটি কাটছিল। প্রতাপের সঙ্গে ছিলেন বনরক্ষী সুরেশ ও অজয়। পরে তাঁরা অন্য বনকর্মীদেরও সেখানে ডেকে পাঠান।

ডেপুটি পুলিশ সুপার জানান, ওই এলাকা থেকে যে মাটি তোলা হচ্ছিল, তা ঘন ও আঠালো ধরনের। স্থানীয় ভাবে ‘গারা’ নামে পরিচিত এই মাটি ইট তৈরি, বাড়ির দেওয়ালে পলেস্তারা দেওয়া এবং ফাঁক বোজানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।

মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন প্রতাপগড়ের পুলিশ সুপার বিশাল জাঙ্গিড়। ময়নাতদন্তের পরে প্রতাপের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে পাশের চিতোরগড় জেলার তাঁর নিজের গ্রামে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

পুরস্কার পেয়েছিলেন বনরক্ষার কাজেই

প্রতাপগড়ের উপ বনসংরক্ষক সুরেশ আগরওয়াল প্রতাপকে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, “প্রতাপ সিংহ চুন্ডাওয়াত ছিলেন আমাদের সেরা আধিকারিক।”

শেষকৃত্যস্থল থেকে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে আগরওয়াল জানান, এ বছরের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজ্যস্তরের পুরস্কারের জন্য প্রতাপের নাম মনোনীত করা হয়েছিল। জেলা ও বিভাগীয় স্তরেও তিনি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন।

বন্যপ্রাণী উদ্ধারে, বিশেষ করে চিতাবাঘ ও অজগর উদ্ধারের কাজে সক্রিয় ছিলেন প্রতাপ। চারা তৈরির নার্সারি এবং বৃক্ষরোপণের কাজেও তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিলেন। সাঁতার ও শুটিং-সহ বিভিন্ন খেলাধুলোতেও সক্রিয় ছিলেন।

আগরওয়াল জানান, প্রায় দু’বছর ধরে প্রতাপ প্রতাপগড় জেলায় কর্মরত ছিলেন। তাঁকে ‘শহিদের মর্যাদা’ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।

‘আইনশৃঙ্খলার প্রতি চ্যালেঞ্জ’

প্রতাপের মৃত্যুকে “অত্যন্ত হৃদয়বিদারক” বলে মন্তব্য করেছেন রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গোবিন্দ সিংহ দোতাসরা। তাঁর বক্তব্য, “এটি শুধু এক জন আধিকারিকের হত্যাকাণ্ড নয়; রাজস্থানের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হল, রাজ্যে খনি মাফিয়া এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠল কী করে যে, সরকারি আধিকারিকদের প্রাণ নিতেও তাদের আর ভয় হচ্ছে না?”

এর আগে ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে জয়পুরে প্রতাপকে সম্মানিত করেছিল রাজস্থান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এনার্জি কনজারভেশন সেন্টার। বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল সেই সম্মান।

বন্যপ্রাণী উদ্ধার, পরিবেশরক্ষা, বনভূমি দখলমুক্ত করা এবং বন সুরক্ষায় তাঁর কাজের প্রশংসা করা হয়েছিল ওই সম্মাননায়। বলা হয়েছিল, তাঁর নেতৃত্বে ওই অঞ্চলে এই ক্ষেত্রগুলিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

বনভূমি রক্ষার অভিযানে যে আধিকারিক পুরস্কৃত হয়েছিলেন, বেআইনি খননের অভিযোগে অভিযুক্তদের হাতেই তাঁর এমন মৃত্যু এখন বন দফতরের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।