ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় ইডির তদন্তের এক্তিয়ার নিয়েই প্রশ্ন সনিয়া-রাহুলের
কোনও ব্যক্তির দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থ পাচারের তদন্ত শুরু করার এক্তিয়ার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির নেই—ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় দিল্লি হাই কোর্টে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আবেদনের বিরোধিতা করে এমনই যুক্তি দিয়েছেন সনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী। তাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার-সহ বিভিন্ন অভিযোগের মামলাটির সূত্রপাত বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর অভিযোগ থেকে।
১৮ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টে জমা দেওয়া লিখিত জবাবে সনিয়া ও রাহুলের বক্তব্য, কোনও অপরাধের অভিযোগ এক ব্যক্তি দায়ের করলেই তা ইডিকে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের এক্তিয়ার দিতে পারে না।
তাঁদের যুক্তি, অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ-র অধীনে ইডির তদন্ত চালানোর জন্য একটি ‘মূল অপরাধ’ বা নির্ধারিত অপরাধের অস্তিত্ব থাকা জরুরি। অর্থাৎ, যে অপরাধ থেকে অর্থ বা সম্পদ অর্জিত হয়েছে এবং পরে তা পাচারের অভিযোগ উঠছে, আগে সেই অপরাধের আইনি ভিত্তি থাকতে হবে।
মূল অপরাধ আগে, অর্থ পাচার পরে?
সনিয়া ও রাহুলের আরও বক্তব্য, অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং পিএমএলএ-র তফসিলভুক্ত মূল অপরাধ—দুটির বিচার পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। তাই কোনও ব্যক্তির অভিযোগকে ইডি নিজের তদন্তের ‘ভিত্তিমূলক নথি’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।
তাঁদের দাবি, এই মামলায় পিএমএলএ-র অধীনে তদন্ত চালানো হলে উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হবে। মূল অপরাধের কোনও অর্থবহ তদন্ত না থাকায় ইডিকেই সেই অপরাধের তদন্তের ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে হবে। তাঁদের মতে, তা পিএমএলএ-র কাঠামো ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
লিখিত জবাবে ইডির আগের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, এত দিন সংস্থার অবস্থান ছিল, মূল অপরাধের এফআইআর না থাকলে কোনও সংস্থার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কার্যক্রম শুরু করা যায় না। এমন এফআইআর না থাকলে পিএমএলএ-র অধীনে আদালতও অভিযোগ আমলে নিতে পারে না।
তাঁদের বক্তব্য, “বর্তমান মামলায় কেন সেই অবস্থান উপেক্ষা করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট দফতরই জানে। আপাতদৃষ্টিতেই এটি আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে স্পষ্টত অসংগত।”
ইডির অভিযোগ কী?
ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় ইডির অভিযোগ, সনিয়া ও রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের আরও কয়েক জন পদাধিকারী অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড বা এজেএল-এর প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। ন্যাশনাল হেরাল্ড সংবাদপত্রের প্রকাশক এজেএল একটি শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত নয় এমন পাবলিক লিমিটেড সংস্থা।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি বা এআইসিসি এজেএল-কে ৯০ কোটি ২১ লক্ষ টাকা ঋণ দিয়েছিল। পরে ইয়ং ইন্ডিয়ান নামে একটি অলাভজনক সংস্থা ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে এআইসিসি-র কাছ থেকে ওই ঋণ আদায়ের অধিকার কিনে নেয়। ইয়ং ইন্ডিয়ানে সনিয়া ও রাহুলের সম্মিলিত শেয়ারের পরিমাণ ছিল ৭৬ শতাংশ।
ইডির দাবি, এর পর এজেএল ওই ৯০ কোটি ২১ লক্ষ টাকার বকেয়া ঋণকে প্রতিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৯ কোটি ২ লক্ষ ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তরিত করে ইয়ং ইন্ডিয়ানকে দেয়। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, এই লেনদেনের মাধ্যমে এজেএল-এর শেয়ারহোল্ডার এবং এআইসিসিকে অর্থদানকারী সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হয়েছিল।
এই অভিযোগগুলিই ২০১৪ সালে ইডির কাছে ব্যক্তিগত ভাবে দায়ের করা অভিযোগে তুলেছিলেন বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী।
এখন দিল্লি হাই কোর্টে মূল প্রশ্নগুলির একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া পিএমএলএ-র অধীনে ইডির তদন্তের আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারে কি না। বিষয়টি নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই পরবর্তী প্রক্রিয়ার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।