জম্মু-কাশ্মীরের কলেজ থেকে বই সরাল সরকার, ৯৪ শতাংশই কাশ্মীরের; কোন লেখকের বই বাদ, অজানা

জম্মু-কাশ্মীরের কলেজগুলির পাঠাগার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪,২৪৯টি বই। তার মধ্যে ৯৪ শতাংশই কাশ্মীরের। ‘আপত্তিকর বিষয়বস্তু’ চিহ্নিত করার সরকারি উদ্যোগের আওতায় এই বইগুলি পাঠকদের ব্যবহার থেকে সরানো হয়েছে বলে বিধানসভায় জানিয়েছে সরকার। তবে কোন কোন বই বাদ পড়েছে, লেখকরাই বা কারা—সেই তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সরকারের পদক্ষেপ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, বই বাছাইয়ের মাপকাঠি কতটা স্বচ্ছ।

আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টির নেতা শেখ খুরশিদের প্রশ্নের উত্তরে সরকার জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষা দফতরের নির্দেশিকা মেনে কলেজগুলির বই পরীক্ষা করা হয়েছে। সরকারি বক্তব্য, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, গবেষণা, যুক্তিনির্ভর চিন্তা এবং শিক্ষাগত উৎকর্ষের কেন্দ্রও। তাই সেখানে এমন পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি, যা ‘সাংবিধানিক মূল্যবোধ, শিক্ষাচর্চার স্বাধীনতা, যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন ও বিচার, বিজ্ঞানমনস্কতা, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা’ গড়ে তোলে।

কিন্তু সরকারি উত্তরে সন্তুষ্ট নন শেখ খুরশিদ। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে তিনি বলেন, “এটি পূর্ণাঙ্গ উত্তর নয়। ঠিক কোন কোন বই বা কোন লেখকদের বই সরানো হয়েছে, তা জানতে চাইতে পারিনি। প্রশ্নটি কার্যসূচির আরও পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্নোত্তর পর্বে তা ওঠেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলে যাব।”

২১ লক্ষ বই পরীক্ষা, বাদ ৪,২৪৯

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২১ লক্ষেরও বেশি বই পরীক্ষা করা হয়েছে। এই কাজের জন্য কলেজ, শিক্ষা অধিকর্তার দফতর এবং প্রশাসনিক দফতর—তিন স্তরে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বইয়ের শিক্ষাগত উপযোগিতা ও বিষয়বস্তু যাচাইয়ের পর ৪,২৪৯টি বই পাঠকদের ব্যবহার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে জারি করা নির্দেশিকায় উচ্চশিক্ষা দফতর জানিয়েছিল, শিক্ষাসংক্রান্ত উপকরণের মূল্যায়ন, শিক্ষাগত মান ও বিষয়বস্তু পরীক্ষা, ক্রয়, সুপারিশ, সংগ্রহে রাখা, পাঠকদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সরকারের যুক্তি, তথ্যগত ভাবে ভুল, বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক, বেআইনি অথবা অন্য কোনও ভাবে আপত্তিকর বিষয়বস্তু যাতে কলেজের সংগ্রহে ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য। আগে থেকে থাকা এমন বইও পর্যালোচনার আওতায় আসবে।

নির্দেশিকায় বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সব প্রকাশনা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ‘সন্ত্রাসবাদ, হিংসাত্মক উগ্রপন্থা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করার প্রক্রিয়া অথবা দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, অখণ্ডতা বা নিরাপত্তার পরিপন্থী কোনও কার্যকলাপের প্রচার করে, মহিমান্বিত করে, বৈধতা দেয় বা ন্যায্য বলে প্রতিপন্ন করে’, সেগুলিও এই যাচাইয়ের আওতায় থাকবে।

কী মাপকাঠিতে বাদ বই?

শিক্ষাগত মান ও বিষয়বস্তু যাচাইয়ের জন্য নির্দেশিকায় একাধিক শর্ত রাখা হয়েছে। প্রতিটি বইয়ের শিক্ষাগত প্রাসঙ্গিকতা, তথ্যের যথার্থতা এবং পঠনপাঠনের উপযোগিতা সামগ্রিক ভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

পাশাপাশি দেখতে হবে, বইটি ভারতের সংবিধান, প্রযোজ্য আইন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিধি, সরকারি নীতি এবং উচ্চশিক্ষা দফতরের শিক্ষাগত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না।

তবে ৪,২৪৯টি বইয়ের লেখক ও শিরোনামের তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি যাচাইয়ের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কোন বই আপত্তিকর, কেন আপত্তিকর এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী—এই তথ্যগুলিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।