ডায়ানার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে যখন কথা হয়েছিল, তখন যুবরাজ চার্লসের গলায় শোকের বদলে উচ্ছ্বাস শুনেছিলেন—নতুন স্মৃতিকথায় এমনই দাবি করেছেন ডায়ানার ভাই চার্লস স্পেনসার। তাঁর অভিযোগ, ডায়ানার শেষকৃত্যের আগে আর একটি কথোপকথনে চার্লস বলেছিলেন, ‘‘আমরা ওকে অচিরেই ভুলে যাব।’’
প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানার মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরে, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে স্পেনসারের স্মৃতিকথা ‘সোয়ান সং: ডায়ানা, মাই সিস্টার’। দিদির দাম্পত্য, মানসিক যন্ত্রণা, দুই ছেলের শোক এবং রাজপরিবারের আচরণ নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করেছেন তিনি।
তবে এগুলি স্পেনসারের স্মৃতিচারণ ও ব্যাখ্যা। রাজপ্রাসাদ তাঁর বিবরণের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছে। শোক এবং এত বছরের ব্যবধান তাঁর স্মৃতিকে প্রভাবিত করেছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে প্রাসাদ। স্পেনসার অবশ্য তাঁর স্মৃতিচারণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় খারিজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি সত্যিই বলছেন। বইটির আলোচিত দশটি দাবি তুলে ধরা হল।
১. ‘আমরা ওকে অচিরেই ভুলে যাব’
সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি ডায়ানার শেষকৃত্যের আগের কয়েক দিনের মধ্যে স্পেনসার ও তৎকালীন যুবরাজ চার্লসের একটি ফোনালাপ নিয়ে। মায়ের কফিনের পিছনে উইলিয়াম ও হ্যারিকে হাঁটানোর সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন স্পেনসার। তখন তাঁদের বয়স যথাক্রমে ১৫ ও ১২। স্পেনসারের যুক্তি ছিল, নিজের ছেলেদের এমন প্রকাশ্য মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে দিতে চাইতেন না ডায়ানা।
স্পেনসারের দাবি, এর পরে আর একটি ফোনালাপে চার্লস প্রচণ্ড রেগে যান এবং স্পেনসার পরিবারের কর্তব্যবোধ নিয়ে কটাক্ষ করেন। তার পরেই নাকি বলেন, ‘‘আমরা ওকে অচিরেই ভুলে যাব।’’ কথাটি শুনে এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন স্পেনসার যে তিনি ফোন রেখে দেন।
পরে স্পেনসার জোর দিয়ে বলেছেন, চার্লস ‘‘ঠিক এই কথাগুলিই’’ বলেছিলেন। তাঁর দাবি, সেই সময়েই বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের তিনি কথোপকথনটির কথা জানিয়েছিলেন।
ওই ফোনালাপের কোনও বিস্তারিত বিকল্প বিবরণ দেয়নি রাজপ্রাসাদ। বরং তাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, শোক এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান স্পেনসারের স্মৃতিকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে কি না।
২. ‘যেন লটারি জিতেছেন’—চার্লসের গলা শুনে মনে হয়েছিল স্পেনসারের
১৯৯৭ সালের ৩১ অগস্ট প্যারিসে ডায়ানার মৃত্যুর কিছু পরেই চার্লসের সঙ্গে কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্পেনসার। তাঁর দাবি, অন্য যাঁরা ফোন করেছিলেন, তাঁদের গলায় ছিল স্তব্ধতা; অনেকেই কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অথচ চার্লসের গলায় তিনি শুনেছিলেন ‘‘বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস—যেন লটারি জিতেছেন’’।
স্পেনসার আরও লিখেছেন, তাঁর সন্দেহ হয়েছিল, ডায়ানার মৃত্যু হয়তো চার্লসের মনে এই ভাবনা এনে দিয়েছিল যে এ বার তিনি তাঁর ভালবাসার মানুষ ক্যামিলাকে বিয়ে করতে পারবেন।
তবে স্পেনসার স্বীকার করেছেন, এটি তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা। চার্লস আসলে কী ভাবছিলেন, তা তিনি জানতেন না। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও স্পেনসার বলেছেন, চার্লসের মনের কথা নিশ্চিত করে বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়; কথোপকথনের সুর থেকেই তিনি ওই অনুমান করেছিলেন।
৩. মায়ের কফিনের পিছনে দুই ছেলেকে হাঁটানোর বিরোধিতা
স্পেনসারের দাবি, রাজপ্রাসাদের এক উচ্চপদস্থ সহকারী তাঁকে জানিয়েছিলেন, মায়ের কফিনের পিছনে হাঁটবে উইলিয়াম ও হ্যারি। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ডায়ানা কখনও চাইতেন না, তাঁর ছোট দুই ছেলেকে এমন মর্মান্তিক দৃশ্যের অংশ করা হোক।
স্পেনসার লিখেছেন, সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে চার্লস লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কফিনের পিছনে নিজের হাঁটার অভিজ্ঞতার কথা তুলেছিলেন। জবাবে স্পেনসার বলেন, মাউন্টব্যাটেনের মৃত্যুর সময় চার্লস প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। উইলিয়াম ও হ্যারি তখনও শিশু, আর তারা হারিয়েছে নিজের মাকে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ডায়ানার শেষযাত্রায় তাঁর কফিনের পিছনে দুই রাজপুত্রই হেঁটেছিলেন। পরবর্তী সময়ে উইলিয়াম ওই অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন।
৪. বিয়ের আগেই ডায়ানার আশঙ্কা: চার্লস তাঁকে ভালবাসেন না
বইয়ে চার্লস ও ডায়ানার সম্পর্কের শুরুর দিনগুলিতেও ফিরে গিয়েছেন স্পেনসার। তাঁর দাবি, ১৯৮১ সালে বিয়ের কিছু আগে ডায়ানা তাঁদের বাবাকে বলেছিলেন, যে মানুষ তাঁকে ভালবাসেন না, তাঁকে বিয়ে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
স্পেনসারের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বিয়ের আগে তিনি দিদিকে অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় দেখেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, চার্লস ডায়ানাকে বলেছিলেন, তাঁকে বিয়ে করতে তিনি ‘‘খুবই খুশি’’, কিন্তু তাঁর প্রেমে পড়েননি।
১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই সেন্ট পল্স ক্যাথিড্রালে চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে হয়। পরের দশকে তাঁদের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে তাঁরা আলাদা থাকার কথা ঘোষণা করেন। বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয় ১৯৯৬ সালে।
৫. গভীর মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন ডায়ানা, দাবি ভাইয়ের
স্মৃতিকথায় ডায়ানার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গও এসেছে। স্পেনসার লিখেছেন, জীবনের সবচেয়ে অসুখী কিছু পর্বে তাঁর দিদির আবেগ কখনও প্রবল বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ পেত। তাঁর দাবি, নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে একবার গাড়ি চালিয়ে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিচি হেডে গিয়েছিলেন ডায়ানা।
স্পেনসারের বিবরণ অনুযায়ী, উইলিয়াম ও হ্যারির প্রতি ভালবাসাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেই ভাবনা থেকে ফিরিয়ে আনে।
তবে ডায়ানার ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা সম্পর্কে এটি বহু বছর পরে লেখা তাঁর ভাইয়ের বিবরণ; স্বাধীন ভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনও চিকিৎসাগত মূল্যায়ন নয়।
৬. মাকে হারিয়ে হ্যারি প্রয়োজনীয় যত্ন পাননি, মনে করেন স্পেনসার
ডায়ানার শেষকৃত্যের পরে ১২ বছরের হ্যারিকে দেখার স্মৃতি তুলে ধরেছেন স্পেনসার। তাঁর বর্ণনায়, হ্যারি তখন ‘‘ছোট্ট, রোগা, সর্বহারা’’। মায়ের মৃত্যুর পরে ছেলেটির প্রয়োজন ছিল শান্ত পরিবেশ ও মানসিক আশ্রয়। স্পেনসারের বিশ্বাস, সেই যত্ন যথেষ্ট পরিমাণে পায়নি হ্যারি।
বইয়ে ছোট ভাগ্নেকে নিয়ে স্পেনসারের বিশেষ উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। এত অল্প বয়সে মাকে হারানোর অভিঘাত পরবর্তী জীবনে হ্যারির উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও চিন্তিত ছিলেন তিনি।
ডায়ানার প্রতি সংবাদমাধ্যমের আচরণের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে হ্যারি ও মেগানের প্রতি আচরণের মিলও খুঁজে পেয়েছেন স্পেনসার। তাঁর কথায়, দিদির সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার ‘‘প্রতিধ্বনি’’ তিনি দেখতে পান।
৭. মৃত্যুর পরে ডায়ানাকে রাজকীয় সম্বোধন ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন রানি?
ডায়ানার শেষকৃত্যের পরের একটি কথোপকথনের কথা জানিয়েছেন স্পেনসার। তাঁর দাবি, পরিবার যখন ডায়ানার সমাধিস্থল আলথর্পে ফিরছিল, তখন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ব্যক্তিগত সচিব রবার্ট ফেলোজ তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।
স্পেনসারের বক্তব্য, ফেলোজ তাঁকে জানিয়েছিলেন, রানি ডায়ানাকে মরণোত্তর ‘হার রয়্যাল হাইনেস’ বা ‘এইচআরএইচ’ সম্বোধন ফিরিয়ে দিতে চান।
১৯৯৬ সালে চার্লসের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পরে ডায়ানা ওই রাজকীয় সম্বোধন ব্যবহারের অধিকার হারিয়েছিলেন। যদিও ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ উপাধি তাঁর ছিল।
স্পেনসার লিখেছেন, মৃত্যুর পরে এই সম্মান ফিরিয়ে দেওয়াকে অর্থহীন মনে হওয়ায় তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে পরে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, উইলিয়াম ও হ্যারির কথা ভেবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করাই কি উচিত ছিল?
৮. রাজকীয় ট্রেনে চার্লসের সঙ্গে কি দেখা করেছিলেন ক্যামিলা? সন্দেহ ছিল ডায়ানার
চার্লস ও ডায়ানার বিয়ের আগের বছর, ১৯৮০ সালের একটি ঘটনাও বইয়ে ফিরে এসেছে। সে সময় একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, সোনালি চুলের এক মহিলা গোপনে রাজকীয় ট্রেনে চার্লসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। খবরটি ঘিরে বিতর্ক হয়। বাকিংহাম প্যালেস জানায়, ওই মহিলা ডায়ানা নন।
স্পেনসার লিখেছেন, পরে ডায়ানার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল, ওই মহিলা ক্যামিলা পার্কার বোলস হয়ে থাকতে পারেন। কথিত সাক্ষাতের জায়গা এবং সেখান থেকে ক্যামিলার বাড়ির নৈকট্য ছিল তাঁর সন্দেহের অন্যতম কারণ।
৯. মহম্মদ আল-ফায়েদের বিরুদ্ধে ডায়ানাকে যৌন হেনস্থার অভিযোগ
ডায়ানার মৃত্যুর সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন ডোডি ফায়েদ। ডোডির বাবা মহম্মদ আল-ফায়েদের বিরুদ্ধেও বইয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্পেনসার। তাঁর দাবি, ডায়ানা তাঁকে জানিয়েছিলেন যে আল-ফায়েদ তাঁকে যৌন উদ্দেশ্যে স্পর্শ করেছিলেন এবং অশালীন মন্তব্য করেছিলেন।
স্পেনসার লিখেছেন, ‘‘ডোডির সঙ্গে সম্পর্কের গোড়ার দিকে মহম্মদ কী করেছিলেন, সে কথা ও আমাকে ঘৃণাভরে বলেছিল। মহম্মদ ওর কাছে এসে নিতম্বে হাত রেখে চেপে ধরেন। তার পরে কামুক, ইঙ্গিতপূর্ণ গলায় বলেন, ‘আর মিশরে কিন্তু শ্বশুরের পালা আগে আসে…’।’’
আল-ফায়েদের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের আরও বহু অভিযোগ পরবর্তী বছরগুলিতে প্রকাশ্যে এসেছে। সেই পটভূমিতেই স্পেনসারের এই নতুন দাবি সামনে এল।
১০. সংবাদমাধ্যমের আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ডায়ানা
ডায়ানার জীবনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার প্রসঙ্গ বারবার এসেছে স্মৃতিকথায়। স্পেনসারের বর্ণনায়, দাম্পত্য ভাঙতে থাকা এবং খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিরন্তর নজরদারির সামনে আরও বেশি করে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন তাঁর দিদি।
ডায়ানার প্রতি সংবাদমাধ্যমের আচরণে তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে শেষকৃত্য থেকে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের দূরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন স্পেনসার।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হ্যারি ও মেগানকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের আচরণের সঙ্গেও ডায়ানার অভিজ্ঞতার তুলনা টেনেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, লাগাতার সমালোচনা ডায়ানাকে গভীর ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। আজও সেই আচরণের প্রতিধ্বনি শুনতে পান তিনি।