প্রতিবেদন: ১৫টি রুপোর মুদ্রা উঠেছিল মাটি থেকে। কিন্তু ধাতু-সন্ধানী যন্ত্র তখনও থামেনি। জার্মানির ভেসেলিংয়ের একটি চাষের জমিতে খুঁজতে গিয়ে অলিভার রিডল বুঝেছিলেন, মাটির নীচে আরও কিছু রয়েছে। নিজে খুঁড়ে সব তুলে নেওয়ার বদলে খবর দেন প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরে। বিশেষজ্ঞদের খননে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে ৯৩৪টি রোমান রুপোর মুদ্রা। প্রায় ৩.১ কিলোগ্রাম ওজনের সেই সঞ্চয়ই ২২ সেপ্টেম্বর প্রথম বার জনসমক্ষে এল বন শহরের এলভিআর জাদুঘরে।

আবিষ্কারের দিন আর প্রকাশ্যে আসার দিন এক নয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম সন্ধান মিলেছিল গত বছর। এরপর উদ্ধার, পরীক্ষা ও সংরক্ষণের পর দর্শকদের সামনে আনা হয়েছে মুদ্রাগুলি। তবে একে জার্মানির সর্বকালের বৃহত্তম রোমান ধনভান্ডার বলা ঠিক হবে না। এর বিশেষত্ব হল, এটি সম্রাট হাড্রিয়ানের সময়ের মুদ্রাভান্ডারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সময়সীমা বাদ দিয়ে দাবি করলে আবিষ্কারের গুরুত্বের অর্থই বদলে যায়।

এক ভান্ডারে কয়েক যুগ

ভান্ডারের সবচেয়ে নতুন মুদ্রাটি তৈরি হয়েছিল ১২৪ বা ১২৫ খ্রিস্টাব্দে। সবচেয়ে পুরনোটি ১৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের। অর্থাৎ সেটি মাটির নীচে যাওয়ার আগেই ২৭০ বছরের বেশি পুরনো হয়ে গিয়েছিল—তবু তখনও লেনদেনে গ্রহণযোগ্য।

বেশির ভাগ মুদ্রা ফ্লাভিয়ান সম্রাটদের আমলের, অর্থাৎ ৬৯ থেকে ৯৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি। একই সঞ্চয়ের মধ্যে তাই কয়েক প্রজন্মের শাসকের ছাপ। নতুন সম্রাট সিংহাসনে বসলেই পুরনো মুদ্রা বাতিল হয়ে যেত না—এই ভান্ডার যেন সেই দীর্ঘ ব্যবহারকালেরই একটি ছোট্ট দলিল।

রুপোর দাম, নাকি ছয় বছরের মজুরি?

আজকের বাজারে ৩.১ কিলোগ্রাম রুপোর দাম দিয়ে এই সঞ্চয়ের প্রাচীন মূল্য বোঝা যাবে না। গবেষকদের তুলনা অনুযায়ী, এক সাধারণ রোমান সৈন্য বছরে প্রায় ৩০০ দেনারি পেতেন। খাবার ও সরঞ্জামের খরচে তার প্রায় অর্ধেক কেটে যেত। বাকি সবটুকু জমাতে পারলেও এই ভান্ডারের সমপরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে লাগত প্রায় ছয় বছর

তবে এই তুলনা কেবল মুদ্রাগুলির সম্ভাব্য ক্রয়ক্ষমতার একটা ধারণা দেয়। সঞ্চয়টি কোনও সৈন্যেরই ছিল—এমন প্রমাণ নেই। কে মালিক ছিলেন, কেন মাটির নীচে পুঁতে রাখা হয়েছিল, আর তিনি কেন তা আর ফিরে পাননি—সবই এখনও অজানা।

মুদ্রার সঙ্গে মাটিও গুরুত্বপূর্ণ

উদ্ধারের পদ্ধতিটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুদ্রাগুলি একে একে টেনে তোলার বদলে আশপাশের মাটিসহ একটি খণ্ড হিসেবে সরানো হয়। পরিষ্কার করার আগে করা হয় এক্স-রে।

মাটির পাত্রের টুকরো এবং খড়ের চিহ্ন থেকে গবেষকদের ধারণা, খড় বিছানো একটি পাত্রে সঞ্চয়টি রাখা হয়েছিল। পরে চাষের সময় পাত্রটি ভেঙে গেলে কিছু মুদ্রা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। তবে এগুলি পরীক্ষালব্ধ সূত্র থেকে তৈরি ব্যাখ্যা, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ নয়।

শখের খোঁজ, গবেষকের দায়িত্ব

রিডলের অনুসন্ধান ছিল অনুমতিপ্রাপ্ত। এলভিআরের নিয়ম অনুযায়ী, ধাতু-সন্ধানী যন্ত্র দিয়ে অনুসন্ধানের পর প্রত্নবস্তু উদ্ধার করতে বিশেষ অনুমতি লাগে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা, অনুসন্ধানের জমির মানচিত্র এবং প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষা—সবই সেই প্রক্রিয়ার অংশ।

অর্থাৎ শখের অনুসন্ধানকারী ও বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা সম্ভব, কিন্তু মাটির নীচে পাওয়া জিনিস তুলে ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখে দেওয়াই নিয়ম নয়। কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট—অনুমতিহীন খননে বস্তুটির চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কারণ ইতিহাস শুধু মুদ্রার গায়ে লেখা থাকে না। কোথায়, কোন স্তরে, কীসের পাশে একটি বস্তু পাওয়া গেল, সেই তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানের অনুমতি নিতে হলে কোন জমিতে কাজ হবে, সেটিও আগে নির্দিষ্ট করতে হয়। যন্ত্র কেনার স্বাধীনতা আর প্রত্নবস্তু তুলে নেওয়ার অধিকার—দুই এক জিনিস নয়।

থেমে যাওয়াটাই আসল

এই আবিষ্কারের আকর্ষণ তাই শুধু ৯৩৪টি রুপোর মুদ্রায় নয়। অলিভার রিডলের সময়মতো থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্তেও। গুপ্তধনের গল্পে দ্রুত মাটি খুঁড়ে সব তুলে নেওয়াই যেন নায়কের কাজ। এখানে উল্টো—হাত গুটিয়ে নেওয়াই ইতিহাসকে বাঁচিয়েছে।

পাত্রের অবশেষ, খড় এবং মুদ্রাগুলির অবস্থান অক্ষত থাকায় গবেষকেরা শুধু টাকার পরিমাণ নয়, কী ভাবে সেই সঞ্চয় রাখা হয়েছিল, তারও সূত্র পেয়েছেন। বস্তু উদ্ধার আর ইতিহাস উদ্ধার যে এক জিনিস নয়, ভেসেলিংয়ের এই আবিষ্কার সেটাই মনে করিয়ে দেয়।

আর মালিকের গল্প? সেখানে কল্পনার লাগাম টানাই ভাল। কোনও ধনী ব্যক্তি বিপদের আশঙ্কায় রাতের অন্ধকারে টাকা পুঁতেছিলেন, কিংবা যুদ্ধ তাঁকে আর ফিরতে দেয়নি—এমন গল্প বানানো সহজ। কিন্তু তার প্রমাণ নেই।

দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় পরে তাঁর সঞ্চয় ফিরে এসেছে মাটির নীচ থেকে। সঞ্চয়ের নাম আছে, মালিকের নাম নেই। সেই অসম্পূর্ণতাই হয়তো এই আবিষ্কারের সবচেয়ে মানবিক অংশ।