ব্যাংককের উত্তরের ধানখেতে এখন আকাশের চেয়ে পাম্পের উপরই বেশি ভরসা বুনমার্ক মার্কসুকের। ৫৫ বছরের এই চাষিকে ফসল বাঁচাতে মাটির নীচ থেকে জল তুলতে হচ্ছে। বৃষ্টি কম মানেই শুধু শুকনো মাঠ নয়—সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি, সার এবং চাষের খরচ। ২২ সেপ্টেম্বরের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মাঠপ্রতিবেদনে বুনমার্কের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় উদ্বেগের একটি ছোট ছবি হয়ে উঠেছে। আজ ফসল বাঁচাতে কত খরচ হবে, আর আগামী মৌসুমে জল মিলবে তো—দুই চিন্তাই একসঙ্গে ঘুরছে তাঁর মাথায়।
এর বৈজ্ঞানিক পটভূমি অবশ্য সেপ্টেম্বরের খবরের আগেই তৈরি হয়েছিল। ৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছিল, এল নিনো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বছরের শেষের দিকে তা অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। সংস্থার পূর্বাভাসদাতা কেন্দ্রগুলির প্রায় সর্বসম্মত মত, পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে ভুল ভাবে পড়ার সুযোগ আছে। কাছাকাছি শতভাগ সম্ভাবনা বলতে এল নিনোর পরিস্থিতি টিকে থাকার সম্ভাবনাকে বোঝানো হয়েছে; কোনও নির্দিষ্ট জেলার খরা, কোনও কৃষকের ফসলহানি বা নির্দিষ্ট দিনের বৃষ্টির অভাবের নিশ্চয়তা নয়। তাই সেপ্টেম্বরের মাঠের অভিজ্ঞতা এবং আগের মৌসুমি পূর্বাভাসকে একই জিনিস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এল নিনো আসলে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক পরিবর্তনের একটি উষ্ণ পর্যায়। এটি কোনও দেশের স্থানীয় তাপপ্রবাহের নাম নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জলের তাপমাত্রা বদলালে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির ধরনও পাল্টাতে পারে। এর বিপরীত শীতল পর্যায়কে বলা হয় লা নিনা। এই ওঠানামার কারণেই একই সময়ে পৃথিবীর এক প্রান্তে বৃষ্টির ঘাটতি, অন্য প্রান্তে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সতর্কতায় তাই শুধু খরার কথা নেই। বন্যা এবং অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকির কথাও রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ তীব্রতা পার হওয়ার পরেও প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। কৃষি, জল, শক্তি, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলিকে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পূর্বাভাসও কোনও একক কম্পিউটার মডেলের ফল নয়; বিভিন্ন মডেল এবং জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবার বিশেষজ্ঞ মত মিলিয়ে তৈরি। আর স্থানীয় ভাবে কখন বৃষ্টি হবে বা কোথায় কতটা ঘাটতি হবে, তা জানতে নিয়মিত স্থানীয় পূর্বাভাসের প্রয়োজন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলসংকটকে শুধু ধানের মাঠ দিয়ে বোঝাও কঠিন। মেকং নদী কমিশনের ব্যাখ্যায়, নদীর জল, মাছ এবং কৃষি একই খাদ্যব্যবস্থার অংশ। জলবিদ্যুৎ বাঁধ, সেচের বিস্তার, বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো এবং জলবায়ুর পরিবর্তন—সবই নদীর মাছের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব মাছ কমলেই তার পুরো দায় এল নিনোর উপর চাপানো যেমন ঠিক নয়, তেমনই আবহাওয়ার চাপ উপেক্ষা করে স্থানীয় জেলেদের দায়ী করাও অসম্পূর্ণ। নদীর জল একসঙ্গে কৃষি, নৌযান, শক্তি উৎপাদন এবং মৎস্যসম্পদের প্রয়োজন মেটায়। এক জায়গায় বেশি জল তোলা অন্য জায়গায় তার প্রভাব ফেলতে পারে।
মেকং নদী কমিশনের কাজের মধ্যে মাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ জলজ আবাস রক্ষা এবং স্থানীয় ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কিন্তু এগুলি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার কথা। সেপ্টেম্বরের এই মুহূর্তে কত মাছ কমেছে, কত কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা কোথায় ঠিক কতটা জল ঘাটতি তৈরি হয়েছে—তার নতুন, অঞ্চলভিত্তিক হিসাব আলাদা করে প্রয়োজন।
বুনমার্কের পাম্প তাই শুধু একটি কৃষিযন্ত্র নয়, বড় এক সমস্যার ছোট প্রতীক। একজন কৃষক আজ জল না তুললে ফসল নষ্ট হতে পারে। কিন্তু সবাই যদি একসঙ্গে ভূগর্ভস্থ বা নদীর জল বেশি তুলতে শুরু করেন, তাহলে অন্য ব্যবহারকারীর উপর চাপ বাড়বে। ফলে ‘খরা আসছে’ বলে সতর্ক করাই যথেষ্ট নয়। কখন বোনা নিরাপদ, কোথায় সেচ সীমিত করতে হবে এবং ছোট চাষির জন্য কী সহায়তা থাকবে—সেই তথ্যই শেষ পর্যন্ত বেশি কাজে লাগে।
এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে, তা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু মাঠের মানুষের প্রশ্ন আরও ছোট, আরও কঠিন—আজ পাম্প চালানোর তেল জুটবে তো? আগামী সপ্তাহে জল থাকবে তো? ফসল বিক্রি করে খরচটা উঠবে তো?
আবহাওয়ার পূর্বাভাসের আসল মূল্য তাই শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা কতটা ঠিকঠাক মাপল, তাতে শেষ হয় না। সেই তথ্য সময়মতো কৃষকের সিদ্ধান্তে পৌঁছল কি না, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বুনমার্কের জমি গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষতির পরিসংখ্যান নয়। কিন্তু তাঁর পাম্পের শব্দ বুঝিয়ে দেয়, মহাসাগরের বহু দূরের একটি আবহাওয়াগত পরিবর্তন কী ভাবে শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে কৃষকের ডিজেলের খরচ, জলের চিন্তা আর সংসারের হিসাবের মধ্যে।