ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত লুকসম্যাক্সিং প্রচারক ক্ল্যাভিকুলার, চেহারা বদলের নেশায় বিপজ্জনক পথে তরুণেরা

চেহারা আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে নিজের মুখে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছেন তিনি। অন্তত সমাজমাধ্যমে এমনই দাবি করেছেন কুড়ি বছরের ব্রেডেন পিটার্স, যিনি ‘ক্ল্যাভিকুলার’ নামে পরিচিত। ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এই তরুণ ইনস্টাগ্রামে দশ লক্ষেরও বেশি অনুগামীর মালিক। চেহারাকে একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ছাঁচে ফেলার প্রবণতা ‘লুকসম্যাক্সিং’-এর অন্যতম প্রচারক তিনি। কিন্তু আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার এই তাগিদে কিছু তরুণ কেন পৌঁছে যাচ্ছেন এমন বিপজ্জনক পদ্ধতির দিকে?

পিটার্স নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ‘বোনস্ম্যাশিং’ করে দেখেছেন। অর্থাৎ, চোয়ালের হাড়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা। এর পিছনে রয়েছে একটি অবৈজ্ঞানিক ধারণা: আঘাতের ফলে হাড় নতুন করে গড়ে উঠবে এবং চোয়াল হয়ে উঠবে আরও তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট। কিন্তু হাড় ভেঙে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে মুখের গড়ন বদলানোর এই পদ্ধতি যে গুরুতর চোটের কারণ হতে পারে, সেই সতর্কতাকে ছাপিয়ে কী ভাবে এমন ধারণা অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে?

নামেই কণ্ঠাস্থি, লক্ষ্য চেহারা

‘ক্ল্যাভিকুলার’ নামটি এসেছে ‘ক্ল্যাভিকল’ থেকে। এর অর্থ কণ্ঠাস্থি—ঘাড়ের নীচে, বুকের উপরের দিকে থাকা হাড়। লুকসম্যাক্সিংয়ের অনুগামীরা শরীরের যে অঙ্গগুলিকে সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, কণ্ঠাস্থি তারই একটি।

আমেরিকার নিউ জার্সিতে বেড়ে ওঠা পিটার্স কোভিডের সময় প্রথম লুকসম্যাক্সিং-সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হন। বহু তরুণের মতো তিনিও তখন টিকটকের মতো সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটাতেন। ধীরে ধীরে অনলাইনে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। লুকসম্যাক্সিংয়ের দর্শন, চেহারা বদলের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে থাকেন। সেই সূত্রেই বাড়তে থাকে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা।

তবে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটিই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে সিবিএস ৪ মায়ামির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, আঠারো বছরের এক তরুণী পিটার্সের বিরুদ্ধে শারীরিক নিগ্রহ, প্রতারণা এবং যৌন অসদাচরণের অভিযোগ এনেছেন।

সুন্দর হলেই সাফল্য?

লুকসম্যাক্সিংয়ের বৃহত্তর প্রবণতাটি এক দশকেরও বেশি পুরনো বলে মনে করা হয়। তবে ২০২০-এর দশকে রেডিট, টিকটক এবং অন্যান্য অনলাইন আলোচনামঞ্চের হাত ধরে তা আরও ব্যাপক পরিচিতি পায়।

এই মতাদর্শের একটি মূল ধারণা হল, জীবনে সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে চেহারার উপর। সুদর্শন বলে গণ্য হতে হলে মুখ ও শরীরকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলতে হবে। নিরন্তর চেষ্টা চালালে সেই পরিবর্তন সম্ভব বলেও দাবি করা হয়। কাঙ্ক্ষিত ছাঁচটি সাধারণত শ্বেতাঙ্গ, লম্বা, পেশিবহুল পুরুষের—তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট চোয়াল যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

লুকসম্যাক্সিংয়ের একটি লক্ষণীয় দিক হল, পুরুষের চেহারা বদলানোর উপর এখানে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। অথচ নিজেকে আরও সুন্দর করে তোলার এই প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে মূলত নারীর উপরই চাপানো হয়েছে। বহু পুরুষের বক্তব্য, নিজের চোখে নিজেকে আরও ভাল লাগার জন্যই তাঁরা এই পথে হাঁটেন। অন্যেরা আবার প্রেম ও যৌন সম্পর্কের সম্ভাবনা বাড়ানোর সঙ্গে চেহারার পরিবর্তনকে যুক্ত করেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের আকাঙ্ক্ষা কখন, কী ভাবে চেহারা নিয়ে বাধ্যতামূলক এক আদর্শের অনুসরণে পরিণত হয়, সেটিই এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

লুকসম্যাক্সিং থেকে ম্যানোস্ফিয়ার

তরুণ পুরুষদের ঘিরে ইন্টারনেটে আরও কয়েকটি প্রবণতা গড়ে ওঠার সময়েই লুকসম্যাক্সিং জনপ্রিয় হয়েছে। এই বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মতাদর্শের সম্মিলিত পরিসরকে বলা হয় ‘ম্যানোস্ফিয়ার’। এর মধ্যে রয়েছে ‘ইনসেল’ গোষ্ঠীও। শব্দটির অর্থ, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা যৌন সম্পর্কের সঙ্গী পান না।

এই গোষ্ঠীগুলির একাংশ একটি নির্দিষ্ট ধরনের চেহারাকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে। নারীদের আকৃষ্ট করার সম্ভাবনার সঙ্গে চেহারার গড়ন, উচ্চতা ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যের যোগসূত্র খোঁজা হয়।

নিয়ন্ত্রণ শিথিল এমন অনলাইন আলোচনামঞ্চে পুরুষেরা প্রায়ই একে অন্যের চেহারা বিচার করেন, নম্বর দেন। নারীদেরও একই ভাবে মূল্যায়ন করা হয়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মাপ নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামানো এবং চেহারার খুঁটিনাটি নিয়ে নিরন্তর তুলনা এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

ম্যানোস্ফিয়ারের পরিচিত প্রচারকদের একজন অ্যান্ড্রু টেট। নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে পরবর্তী সময়ে তিনিও তদন্তের মুখে পড়েছেন। তবে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মতাদর্শ এবং অপরাধের অভিযোগকে এক করে দেখা যায় না।

অনলাইনে বাড়ছে ক্ষোভের পরিসর

পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এই সব গোষ্ঠী ও প্রবণতার বিস্তারের পিছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ইন্টারনেটের প্রসার, বিশেষ আগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনলাইন সম্প্রদায় এবং সমাজমাধ্যম তার মধ্যে অন্যতম।

অন্যের সাফল্য ও বাহ্যিক চাকচিক্যের সঙ্গে নিজের অবস্থার নিরন্তর তুলনা করার প্রবণতা বাড়িয়েছে এই পরিসরগুলি। পরিচয় গোপন রাখার সুযোগও একটি কারণ। এর ফলে প্রায় কোনও জবাবদিহি ছাড়াই অন্যকে উপহাস করা কিংবা নানা পরামর্শ বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

একই সময়ে বহু পুরুষের মধ্যে নারীবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও দেখা গিয়েছে। নিজেদের সমস্যার জন্য তাঁদের একাংশ সমাজে নারীর পরিবর্তিত ভূমিকা ও লিঙ্গসমতার অগ্রগতিকে দায়ী করেন।

রাজনৈতিক মতাদর্শেরও এখানে ভূমিকা থাকতে পারে। সুইৎজারল্যান্ডের লোজানের সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ইপিএফএলের গবেষকদের একটি গবেষণাপত্রে দেখা গিয়েছে, নতুন ধরনের চরম দক্ষিণপন্থী আন্দোলনের অনলাইন ব্যবহারকারী এবং ম্যানোস্ফিয়ারের ব্যবহারকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

লুকসম্যাক্সিং যে সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে, সেই সময়েই দক্ষিণপন্থী মতাদর্শের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। ম্যানোস্ফিয়ারের বহু ধারণায় পুরুষকেই সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে—এমন রক্ষণশীল অবস্থান দেখা যায়। কোথাও নারীবাদকে হেয় করা হয়, কোথাও বর্ণগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাও প্রচার করা হয়।

তবে এই অনলাইন পরিসরের সব ব্যবহারকারী একই মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে।

চেহারা থেকে হিংসার পথে

এই মতাদর্শের একটি বিপজ্জনক দিক হল, তা কিছু অনুগামীর মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব ও ক্রোধকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। এর অন্তর্নিহিত বার্তা অনেক সময় এমন: নির্দিষ্ট চেহারা না থাকলে মানুষের কোনও মূল্য নেই, জীবনে এগোনোর প্রকৃত সম্ভাবনাও নেই।

পশ্চিমের দেশগুলিতে এমন বিশ্বাসে আচ্ছন্ন কিছু পুরুষ নারী এবং বৃহত্তর সমাজের বিরুদ্ধে হিংসায় জড়িয়েছেন। ২০১৮ সালে কানাডার টরন্টোয় এক ব্যক্তি ভিড়ের মধ্যে ভ্যান চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করেন। তদন্তে তাঁর অনলাইন কার্যকলাপ ও ইনসেল মতাদর্শের সঙ্গে যোগসূত্রের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তবে কোনও একটি অনলাইন প্রবণতাকে সব ধরনের হিংসার সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

সৌন্দর্যের নামে শরীরের ক্ষতি

লুকসম্যাক্সিংয়ের বিরুদ্ধে আপত্তির অন্যতম বড় জায়গা বিজ্ঞান। অনুগামীরা কখনও কখনও এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যার কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই এবং যা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

উচ্চতা বাড়াতে পায়ের হাড় লম্বা করানোর অস্ত্রোপচার কিংবা চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়াই পেপটাইড ও অন্যান্য পদার্থ শরীরে প্রবেশ করানো তার কয়েকটি উদাহরণ।

ক্ল্যাভিকুলার জিকিউ পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি ইন্টারনেট থেকে কেনা টেস্টোস্টেরন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে নিতে শুরু করেন। তাঁর কথায়, অভিভাবক বা চিকিৎসক—কারও তত্ত্বাবধানই ছিল না। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন তাঁর শরীর স্বাভাবিক ভাবে ওই হরমোন তৈরি করতে পারে না। নিজের ধারণা অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম।

টেস্টোস্টেরন ব্যবহারের মতো হরমোন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান ছাড়া নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুরুষত্বের সংকট, নাকি পরিচয়ের শূন্যতা?

তবে লুকসম্যাক্সিংয়ের সমালোচনা শুধু শারীরিক ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও মৌলিক প্রশ্নটি হল, এই মতাদর্শ নিজের এবং পৃথিবীর সম্পর্কে এমন একটি ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে কি না, যা ব্যক্তিনির্ভর, নিঃসঙ্গ ও হতাশায় আচ্ছন্ন।

পশ্চিমের সমাজে এর ব্যাখ্যা হিসেবে প্রায়ই ‘পুরুষত্বের সংকট’-এর কথা বলা হয়। সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের মধ্যে বহু পুরুষ অনুসরণ করার মতো সুস্থ আদর্শ খুঁজে পাচ্ছেন না—এমন যুক্তি দেওয়া হয়।

সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাঁরা বিজ্ঞানের মোড়কে অবৈজ্ঞানিক দাবি করছেন এবং নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। তাঁদের প্রচারের প্রভাব পড়তে পারে তরুণদের আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান এবং শরীর সম্পর্কে ধারণায়।

চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন শরীরের ক্ষতি, অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড এবং সামাজিক ক্রোধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সৌন্দর্যের সন্ধানই হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ।