দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরাকে চলা আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের শেষ ঘাঁটিগুলি থেকে আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহারের কথা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনাকে নিজেদের জয় হিসেবে তুলে ধরছে ইরান এবং তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি সরে গেলে বাগদাদের রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় তেহরানের প্রভাব আরও বাড়বে কি না।
বর্তমান প্রত্যাহারের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০২৪ সালে জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে ইরাকের সমঝোতায়। সেই প্রক্রিয়াই এখন কার্যকর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ঘটনাটির সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ—আমেরিকা যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্ত, তখনই ইরাকে নিজেদের সামরিক অবস্থান গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে এর প্রভাব ইরাকের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও পড়তে পারে।
দীর্ঘ এক অধ্যায়
ইরাকে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির ইতিহাস অবশ্য নিরবচ্ছিন্ন নয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনকে উৎখাতের অভিযানের পর শুরু হয় দখলদারি, বিদ্রোহ এবং দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ২০১১ সালে আমেরিকান বাহিনী ইরাক ছেড়ে যায়।
কিন্তু ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করলে বাগদাদের আমন্ত্রণে ফের আসে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট। আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দেওয়াই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভূমিকা।
এ বার সেই সামরিক উপস্থিতিও শেষ হতে চলেছে।
বাগদাদের আশা
ইরাকি সরকারের কাছে এই পরিবর্তন মূলত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। সরকারি মুখপাত্র হায়দার আল-আবুদি জানিয়েছেন, জোটভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক এখন পারস্পরিক স্বার্থ এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক কাঠামোয় এগোবে।
নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও সশস্ত্র বাহিনী যথেষ্ট সক্ষম বলেও দাবি করেছে সরকার।
বাগদাদের লক্ষ্য শুধু নিরাপত্তা নয়। দেশের ভূখণ্ডের উপর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থাৎ আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারকে ইরাক শুধু সামরিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না; অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও দেখছে।
মিলিশিয়াই বড় প্রশ্ন
তবে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা।
সুফান সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরাকে কয়েকটি শক্তিশালী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকারি সামরিক নির্দেশব্যবস্থার বাইরে সক্রিয়। তাদের নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সরকার সেই প্রক্রিয়ার সময়সীমা পিছিয়েছে।
ফলে বিদেশি সেনা চলে গেলেই যে অস্ত্রের উপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
কুর্দিদের উদ্বেগ
উত্তর ইরাকের কুর্দি নেতৃত্বও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে বলেছেন, আমেরিকার প্রত্যাহারের ফলে তাঁদের অঞ্চল ইরানের আক্রমণের সামনে আরও অসুরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে।
তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতি এবং বাগদাদের সঙ্গে ক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন।
আইএস কি ফিরবে?
আরও একটি প্রশ্ন আইএসকে ঘিরে। সংগঠনটি ইরাকে তার নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড হারালেও গোপন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
তবে অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আমেরিকার প্রত্যাহার মানেই আইএসের অনিবার্য পুনরুত্থান নয়। ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজন ধারাবাহিক গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা।
আমেরিকা থাকবে অন্য ভাবে
সেনা চলে গেলেও ইরাকে আমেরিকার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। কূটনৈতিক সম্পর্ক, অস্ত্র বিক্রি, জ্বালানি ও পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং আর্থিক যোগাযোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ থাকবে।
তবে সামরিক ঘাঁটির প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছাড়া সেই সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। অন্য দিকে, ইরানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র যোগাযোগগুলি বহাল থাকছে।
সামনে কোন পথ?
ফলে ইরাকের সামনে এখন সুযোগ এবং অনিশ্চয়তা পাশাপাশি। বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর বাড়াতে পারে। কিন্তু সেই পরিসর কতটা কার্যকর ভাবে নির্বাচিত সরকার ব্যবহার করতে পারবে, আর কতটা প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির হাতে চলে যাবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পরবর্তী অধ্যায়ের গতিপথ নির্ভর করবে বাগদাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর ভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারে এবং দেশের বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে কতটা সমন্বয় তৈরি করতে পারে তার উপর। শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হবে ইরাকি নাগরিকদের নিরাপত্তা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।