“তিনি এমন ভাবে গান করেন, যেন নিয়তির সঙ্গে তর্ক করছেন।” গ্যারি স্টুয়ার্ট সম্পর্কে বব ডিলানের এই মন্তব্যই হয়তো সবচেয়ে নিখুঁত ভাবে ধরে তাঁর কণ্ঠের জাদু। সেই গলায় ছিল ভাঙনের শব্দ, যন্ত্রণার ছাপ এবং এমন এক অস্বস্তিকর সত্য, যা শুনলে মনে হত—গায়ক শুধু বিপর্যয়ের কথা গাইছেন না, যেন নিজেই তার পরিণতি বয়ে চলেছেন।
সত্তরের দশকে মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের দুনিয়ায় গ্যারি স্টুয়ার্ট যথেষ্ট পরিচিত নাম ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ‘She’s Acting Single (I’m Drinking Doubles)’ কান্ট্রি চার্টের শীর্ষে পৌঁছয়। উইলি নেলসন, ট্যামি উইনেট থেকে দ্য ক্ল্যাশের জো স্ট্রামার—বহু বিশিষ্ট শিল্পী তাঁর গানের ভক্ত ছিলেন। অথচ ২০০৩ সালে ৫৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রায় নিঃশব্দেই হারিয়ে যায়।
খ্যাতি থেকে বহু আগেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন স্টুয়ার্ট। ফ্লোরিডার একটি ট্রেলার-বাড়িতে স্ত্রী মেরি লু-র সঙ্গে কাটত তাঁর শেষ জীবন। কালো পর্দায় ঢাকা জানলার আড়ালে চলত মাদকাসক্তি, মানসিক অসুস্থতা এবং আত্মবিনাশের দীর্ঘ অধ্যায়।
দুই দশকেরও বেশি সময় পরে সেই বিস্মৃত শিল্পীকেই নতুন করে আবিষ্কার করছে সংগীতজগৎ।
পুরনো কণ্ঠে নতুন উন্মাদনা
এই প্রত্যাবর্তনের অন্যতম কারণ জিমি ম্যাকডোনোর জীবনী ‘Gary Stewart: I Am From the Honky Tonks’। গত নভেম্বরে প্রকাশিত বইটি পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত সাড়া ফেলেছে। নিল ইয়ং, আল গ্রিন, ট্যামি উইনেট ও চলচ্চিত্রকার রাস মেয়ারকে নিয়ে জীবনী লেখা ম্যাকডোনোর দাবি, গ্যারি স্টুয়ার্টকে নিয়ে বইয়ের প্রকাশক খুঁজে পাওয়াই তাঁর সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। অথচ প্রকাশের পরে এটিই তাঁর সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া বই।
একই সময়ে ডেলমোর রেকর্ডিং সোসাইটি প্রকাশ করেছে ‘One Track Mind’, যেখানে সত্তরের দশকের গোড়ায় রেকর্ড করা স্টুয়ার্টের কিছু ডেমো রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের কান্ট্রি ও ইন্ডি-রক শিল্পীদের মধ্যেও তাঁর প্রভাব স্পষ্ট। এলা ল্যাংলি, জ্যাক টপ, কার্লি হার্টজম্যান, চার্লি ক্রকেট এবং রায়ান ডেভিস—অনেকেই স্টুয়ার্টের গান ও গায়নশৈলীর প্রশংসা করেছেন। ডেভিসের চোখে তিনি প্রায় “অতিমানব”—এমন এক শিল্পী, যার সংগীতের সত্যতা সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়নি।
কয়লাখনি থেকে ন্যাশভিল
১৯৪৪ সালে কেন্টাকিতে জন্ম গ্যারি স্টুয়ার্টের। বারো ভাইবোনের পরিবার। কয়লাখনির দুর্ঘটনায় বাবা গুরুতর আহত হওয়ার পরে ১৯৫৬ সালে পরিবারটি চলে যায় ফ্লোরিডায়।
কৈশোরেই সংগীতের প্রতি তাঁর অসাধারণ প্রতিভা প্রকাশ পায়। রকাবিলি, কান্ট্রি এবং রিদম অ্যান্ড ব্লুজ—তিন ধারাকেই নিজের মতো করে মিশিয়ে নিতে পারতেন তিনি। কিশোর বয়সে বিভিন্ন ব্যান্ডে বাজানোর পাশাপাশি গানও লিখতেন।
পরে ন্যাশভিলে গিয়ে চার্লি প্রাইডের দলে পিয়ানো বাজান। তাঁর লেখা গান প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা রেকর্ড করলেও একক শিল্পী হিসেবে সাফল্য তখনও অধরা।
পরিবর্তন আসে প্রযোজক রয় ডি-র হাত ধরে। স্টুয়ার্টের কণ্ঠের সম্ভাবনা বুঝে তিনি ১৯৭৩ সালে আরসিএ-র সঙ্গে তাঁর চুক্তি করিয়ে দেন। ১৯৭৪ সালে ‘Drinkin’ Thing’ ও ‘Out of Hand’ জনপ্রিয় হয়। পরের বছর ‘Out of Hand’ অ্যালবাম এবং তার ‘She’s Acting Single’ গান তাঁকে নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে।
কান্ট্রির গলায় পাঙ্কের আগুন
পরবর্তী তিন বছর—‘Steppin’ Out’, ‘Your Place or Mine’ এবং ‘Little Junior’—স্টুয়ার্টের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম উজ্জ্বল সময়।
তাঁর গলায় কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছিল না। ‘Quits’ কিংবা ‘Ten Years of This’-এর মতো বিষণ্ণ গানে ছিল গভীর ক্ষত, আবার দ্রুতলয়ের গানে ফুটে উঠত বেপরোয়া জীবনতৃষ্ণা।
সত্তরের দশকের ন্যাশভিলে পাঙ্ক সংগীতের প্রভাব তেমন ছিল না। কিন্তু স্টুয়ার্টের রুক্ষ কণ্ঠ, উদ্ধত মঞ্চভঙ্গি এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাবের মধ্যে যেন পাঙ্কের বিদ্রোহী আত্মা লুকিয়ে ছিল। দ্য ক্ল্যাশের জো স্ট্রামার তাঁর অনুরাগী হয়ে ওঠেন—যা সেই সময়ের কান্ট্রি জগতের জন্য যথেষ্ট অস্বাভাবিক ব্যাপার।
অনেকে তাঁকে জেরি লি লুইস ও হ্যাঙ্ক উইলিয়ামসের সঙ্গে তুলনা করেন। লুইসের মতো তাঁর গানে ছিল রকাবিলির আগুন, আবার হ্যাঙ্কের মতোই তাঁর ব্যক্তিজীবনে ছিল গভীর আবেগ ও আত্মবিনাশের টান।
শেষ পর্যন্ত সেই আত্মবিনাশই তাঁর সংগীতজীবনকে গ্রাস করে।
ভালোবাসা, নেশা এবং অন্ধকার
গ্যারি স্টুয়ার্টের বয়স যখন ১৬, তখন পরিচয় হয় ২১ বছরের মেরি লু টেলরের সঙ্গে। পরবর্তী জীবনে তাঁদের সম্পর্ক হয়ে ওঠে গভীর প্রেম, আবার একই সঙ্গে পারস্পরিক আত্মবিনাশের এক বন্ধন।
মাদক, গাড়ি দুর্ঘটনা, আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এবং মানসিক অসুস্থতা—সবই ঢুকে পড়ে তাঁদের জীবনে।
স্টুয়ার্টের মেয়ে শ্যানন অ্যাশবার্নের স্মৃতিতে সেই অন্ধকার শৈশব থেকেই পরিচিত ছিল। বাবা-মায়ের মাদকাসক্তি ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মাত্র ১২ বছর বয়সেই মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তাঁকে।
এক বার তাঁর বান্ধবী বাড়িতে রাত কাটাতে এসে গ্যারি স্টুয়ার্টকে অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের পরে অসুস্থ অবস্থায় দেখেছিল। অ্যাম্বুল্যান্স দেখে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও শ্যাননের কাছে ঘটনাটি ছিল প্রায় স্বাভাবিক।
একবার ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু থাকতে চাননি
১৯৮৭ সালে জিমি ম্যাকডোনো নির্জনবাসী স্টুয়ার্টকে খুঁজে বের করেন এবং ‘ভিলেজ ভয়েস’-এ তাঁকে নিয়ে ১১ হাজার শব্দের একটি প্রতিবেদন লেখেন। সাময়িক ভাবে ফের আলোচনায় আসেন স্টুয়ার্ট।
ক্যালিফোর্নিয়ার হাইটোন রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তি করে তিনটি অ্যালবামও প্রকাশ করেন। কিন্তু তখন তাঁর কণ্ঠ অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে, প্রাণশক্তিও কমে এসেছে। আরসিএ-র সময়কার সেই বিস্ফোরণ আর ফিরে আসেনি।
ম্যাকডোনোর মতে, অনেকে স্টুয়ার্টের বড় প্রত্যাবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্টুয়ার্ট নিজেই আর তেমন আগ্রহী ছিলেন না।
এর মধ্যেই ১৯৮৮ সালে তাঁদের ২৫ বছর বয়সি ছেলে জোয়ি আত্মহত্যা করেন। পরে অক্সিকন্টিনের আসক্তি আরও গভীর করে দেয় গ্যারি ও মেরি লু-র জীবনকে।
অর্থের প্রয়োজন হলে মাঝে মাঝে ট্রেলার-বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছোট পানশালা ও নাচের আসরে গান গাইতেন স্টুয়ার্ট। ভাল রাতে এখনও শ্রোতাদের মাতিয়ে দিতে পারতেন।
বড় মঞ্চ তাঁর বিশেষ পছন্দ ছিল না। প্রত্যন্ত এলাকার হনকি-টঙ্ক, ছোট পানশালা এবং সাধারণ মানুষের ভিড়ই ছিল তাঁর আসল জায়গা। টেক্সাসে তিনি প্রায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। আমেরিকার আদিবাসী সংরক্ষিত অঞ্চলগুলিতেও ছিল তাঁর অনুগত শ্রোতা।
ম্যাকডোনোর ব্যাখ্যা, কঠিন জীবনযাপন করা সেই মানুষগুলিই স্টুয়ার্টের গানে নিজেদের জীবনের সত্য খুঁজে পেতেন।
শেষ গান, নতুন জীবন
২০০৩ সালের ২৬ নভেম্বর মারা যান মেরি লু। তিন সপ্তাহ পরে গভীর শোকের মধ্যে আত্মহত্যা করেন গ্যারি স্টুয়ার্ট।
শ্যাননের কথায়, তাঁদের সম্পর্ক ছিল “বনি ও ক্লাইড, রোমিয়ো ও জুলিয়েটের মতো”—এক জন যেন অন্য জনকে ছাড়া বাঁচতেই পারতেন না।
আজ অবশ্য স্টুয়ার্টের গল্পের শেষটা অন্য রকম। স্ট্রিমিং পরিষেবায় তাঁর পুরনো অ্যালবাম নতুন শ্রোতা পাচ্ছে। প্রকাশ্যে আসছে অপ্রকাশিত রেকর্ডিং। তাঁর জীবনী নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই অন্ধকার, বেপরোয়া এবং অদ্ভুত ভাবে সত্যি এক পৃথিবীতে।
শ্যাননের লক্ষ্য, বাবাকে কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে জায়গা করে দেওয়া।
সেই স্বীকৃতি আসবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু গ্যারি স্টুয়ার্টের পুনর্জন্ম যেন ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।
যে মানুষ এক সময় খ্যাতি থেকে পালিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর কণ্ঠ আজ আবার ফিরে এসেছে—ভাঙা, রুক্ষ, অস্থির, অথচ অবিশ্বাস্য রকম সত্য।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।