বাংলাস্ফিয়ার: মানুষের মহাকাশযাত্রা থেকে চাঁদ ও শুক্র গ্রহের অনুসন্ধান—ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর সঙ্গে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে চায় ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএ। গগনযান অভিযানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের স্থলকেন্দ্র থেকে যোগাযোগ ও নজরদারির সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে দুই সংস্থা ইতিমধ্যেই একটি প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা বা টিআইপি স্বাক্ষর করেছে। সেই সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও বিস্তৃত অংশীদারির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তি, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং পরিকাঠামো ভাগ করে ব্যবহারের সম্ভাবনা।
গগনযানের জন্য স্থলকেন্দ্রের সহায়তা সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর। ইএসএ-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জার্মানির মহাকাশ অভিযান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ইউরোপীয় ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বিভিন্ন অ্যান্টেনার কাজ সমন্বয় করা হবে। এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইসরো মহাকাশযানের অবস্থান নির্ণয়, তার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠাতে পারবে। যাত্রীবাহী মহাকাশযানের নিরাপত্তা ও পরিচালনায় এই যোগাযোগব্যবস্থার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
চুক্তি ঘোষণার সময়ে ইএসএ জানিয়েছিল, গগনযানের প্রথম অভিযানে ফরাসি গিয়ানার কুরুতে অবস্থিত তাদের ১৫ মিটার অ্যান্টেনা ব্যবহার করা হবে। পরবর্তী অভিযানগুলিতে জার্মানি ও স্পেনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টেনাও যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। মহাকাশযানের বেতারযন্ত্র এবং স্থলকেন্দ্রের মধ্যে সঠিকভাবে সংকেত আদানপ্রদান সম্ভব হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সামঞ্জস্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়।
সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মহাকাশচারীদের প্রস্তুতি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত পৃথক চুক্তিতে প্রশিক্ষণ, মহাকাশে গবেষণার উপযোগী পরীক্ষার উন্নয়ন ও সংযোজন এবং মানবদেহ ও জীবচিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণার কাঠামো তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ইএসএ-র সুবিধা ব্যবহার এবং যৌথ শিক্ষামূলক কার্যক্রমও এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে সহযোগিতা শুধু মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।
২০২৫ সালের ৭ মে দুই সংস্থা যৌথ অভিপ্রায়পত্রেও স্বাক্ষর করে। সেখানে প্রথম পর্যায়ে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ এবং পরবর্তী পর্যায়ে চাঁদে মানব মহাকাশ অনুসন্ধানে সহযোগিতার কথা বলা হয়। দুই পক্ষের মহাকাশযান যাতে কক্ষপথে পরস্পরের কাছে পৌঁছে যুক্ত হতে পারে, তার জন্য প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য গড়ে তোলাও আলোচ্য। পাশাপাশি রয়েছে পৃথিবীতে মহাকাশ অভিযানের অনুরূপ পরিবেশে অনুশীলন এবং বিশেষ উড়ানে স্বল্পসময়ের ভারহীনতার অভিজ্ঞতা অর্জন।
ইএসএ-র বিবৃতিতে ভারতের পরিকল্পিত মহাকাশ স্টেশনে ইউরোপীয় মহাকাশচারীদের যাত্রা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদে স্বয়ংক্রিয় বৈজ্ঞানিক অভিযান এবং গবেষণাযন্ত্র নিয়ে সমন্বয়ের আলোচনাও রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য পৃথক চুক্তি প্রয়োজন। অর্থাৎ সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ এবং কোনও নির্দিষ্ট অভিযানে অংশগ্রহণ চূড়ান্ত হওয়া পৃথক ধাপ; প্রতিটির কাজের পরিধিও আলাদাভাবে নির্ধারিত
শুক্র অভিযান ভারতের গ্রহবিজ্ঞানের পরবর্তী বড় উদ্যোগগুলির অন্যতম। ইসরোর প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুক্রকে প্রদক্ষিণকারী মহাকাশযান ওই গ্রহের পৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল এবং সৌরবায়ুর সঙ্গে তার পারস্পরিক ক্রিয়া পরীক্ষা করবে। ঘন বায়ুমণ্ডল ও প্রবল উষ্ণতায় ঘেরা এই গ্রহের বিবর্তন বোঝা গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য। এই পটভূমিতেই শুক্র অভিযানে ইএসএ-র সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রেও সহযোগিতার আগ্রহ এবং চূড়ান্ত প্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
চন্দ্রাভিযানের ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য চাঁদের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। চন্দ্রযান-৪ সেই উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত। নমুনা ফেরানো সম্ভব হলে পৃথিবীর গবেষণাগারে উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করে চাঁদের গঠন ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করা যাবে। মহাকাশযানে বহনযোগ্য যন্ত্রের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ মিলবে। ইসরোর বিবরণে নমুনা সংগ্রহ, সুরক্ষিত প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী পরীক্ষাকে এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুই সংস্থার সহযোগিতার নজির অবশ্য পুরনো। চন্দ্রযান-৩ অভিযানে ইএসএ সহায়তা দিয়েছে; আদিত্য-এল১-এর বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহেও তাদের স্থলকেন্দ্রের ভূমিকা রয়েছে। আবার ইএসএ-র প্রোবা-৩ অভিযান উৎক্ষেপণ করেছে ইসরো। এই অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়েই মানব মহাকাশযাত্রা ও গ্রহ অনুসন্ধানে নতুন যৌথ কাজের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।