হাইলাইটস:
- মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সরকার পরিবর্তন না হলে বড় শিল্প বিনিয়োগ ওড়িশায় চলে যেত।
- শিল্পোন্নয়নের জন্য নতুন বিনিয়োগ রোডম্যাপ ঘোষণা, দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের আশ্বাস।
- উৎপাদন, অবকাঠামো, বন্দর, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বিশেষ জোর।
- কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শিল্পবান্ধব প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি।
- তৃণমূল আমলে শিল্পে “স্থবিরতা” ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার অভিযোগ।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের নতুন দিশা দেখানোর লক্ষ্য নিয়ে রাজ্য সরকারের বিস্তৃত বিনিয়োগ রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একইসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন না ঘটলে রাজ্যে আসতে চাওয়া বহু বড় বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত ওড়িশাসহ অন্য রাজ্যে চলে যেত।
এক শিল্প সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, দক্ষ মানবসম্পদ এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে রাজ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা, জমি সংক্রান্ত সমস্যা এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশের অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময় বহু শিল্পগোষ্ঠী প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত অন্য রাজ্যে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “সরকার বদল না হলে বহু শিল্পপ্রকল্প ওড়িশায় চলে যেত। আমরা সময়মতো উদ্যোগ নিয়ে সেই প্রবণতা বদলাতে শুরু করেছি।”
তিনি জানান, নতুন শিল্পনীতি অনুযায়ী বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত অনুমোদন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ছাড়পত্র, ডিজিটাল সিঙ্গল-উইন্ডো ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পৃথক মনিটরিং সেল গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে না।
সরকারের ঘোষিত রোডম্যাপে উৎপাদনশিল্প, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর-সহায়ক শিল্প, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং লজিস্টিক্স অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে শিল্প বিস্তারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে আঞ্চলিক বৈষম্য কমে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। জেলা ভিত্তিক শিল্প ক্লাস্টার, স্টার্ট-আপ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, রাজ্যে নতুন শিল্পাঞ্চল, মালবাহী করিডর, বহুমুখী লজিস্টিক্স পার্ক এবং আধুনিক গুদাম পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজও এগোচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিল্পপতিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নীতিগত স্থায়িত্বের অভাবের কারণে বহু বিনিয়োগকারী পশ্চিমবঙ্গ এড়িয়ে চলেছিলেন। বর্তমান সরকার সেই ভাবমূর্তি বদলাতে কাজ করছে বলে তাঁর দাবি।
তিনি বলেন, সরকার জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তির পথে যাবে না। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি মূলত জমি ব্যাঙ্ক, স্বেচ্ছায় বিক্রি এবং শিল্পোন্নয়নের জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলি থেকেই সংগ্রহ করা হবে। এতে উন্নয়ন ও মানুষের স্বার্থ—দুইয়েরই ভারসাম্য বজায় থাকবে।
রাজ্যের শিল্প দপ্তরের তথ্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ইতিমধ্যেই একাধিক প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে, যার ফলে আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকারের আশা।
তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে “সহযোগিতামূলক প্রশাসন” এবং “সময়বদ্ধ সিদ্ধান্ত”-এর প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিল্পপতিরা যাতে মাসের পর মাস সরকারি দফতরে ঘুরতে বাধ্য না হন, সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনিক সংস্কার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শিল্পায়নকে সামনে রেখে সরকার উন্নয়নমুখী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে “শিল্পে স্থবিরতা”র অভিযোগ তুলে বর্তমান সরকার আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকেই সামনে আনছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও রাজ্যের অর্থনীতির জন্য বড় শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যে আগামী দিনে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত রোডম্যাপ সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।