লগইনসদস্যতালেখক
হোম›ভারত›পাচার ঠেকাতে ভারতের সীমান্তবেড়া, মাথার উপর দিয়ে ১,২০০ বার পাক ড্রোনের হানা
ভারত

পাচার ঠেকাতে ভারতের সীমান্তবেড়া, মাথার উপর দিয়ে ১,২০০ বার পাক ড্রোনের হানা

বারো ফুট উঁচু বেড়া। তার সঙ্গে একাধিক সারিতে কুণ্ডলী পাকানো ক্ষুরধার কাঁটাতার এবং উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎবাহী তার। দেখলে দুর্ভেদ্য বলেই মনে হয়। কিন্তু যে অনুপ্রবেশকারী আকাশপথে উড়ে এসে অস্ত্র, গোলাবারুদ…

পাচার ঠেকাতে ভারতের সীমান্তবেড়া, মাথার উপর দিয়ে ১,২০০ বার পাক ড্রোনের হানা

বারো ফুট উঁচু বেড়া। তার সঙ্গে একাধিক সারিতে কুণ্ডলী পাকানো ক্ষুরধার কাঁটাতার এবং উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎবাহী তার। দেখলে দুর্ভেদ্য বলেই মনে হয়। কিন্তু যে অনুপ্রবেশকারী আকাশপথে উড়ে এসে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদক ফেলে দিয়ে যায়, তাকে আটকানোর ক্ষমতা নেই এই বেড়ার।

পাঞ্জাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর ৪৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেড়া মূলত তৈরি হয়েছিল গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। জঙ্গি তৎপরতার সেই সময়ে উদ্দেশ্য ছিল অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকানো।

সীমান্ত পেরিয়ে পাচার ও ড্রোনের আনাগোনা মোকাবিলায় পাঞ্জাব সরকার যে গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটি গড়েছে, তার সদস্য পিশৌরা সিংহ। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি স্থানীয় থানায় এবং ডেপুটি পুলিশ সুপারকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু তাঁরা ফোন ধরেননি।’’

‘‘শেষ পর্যন্ত তরন তারনের সিনিয়র পুলিশ সুপারকে ফোন করি। তার পরেই স্থানীয় পুলিশ সাড়া দেয়। পরে বিএসএফও আসে।’’ এই এলাকাও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে।

পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, পাকিস্তানের পাঞ্জাবের ভিতরে থাকা বিভিন্ন উৎক্ষেপণস্থল থেকে ড্রোনে চাপিয়ে মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক ভারতে পাঠানো হচ্ছে। প্রায়ই এই কাজ চলছে অন্ধকারের আড়ালে। ২০২৪ সালে পাঞ্জাবে বিএসএফ ও সহযোগী সংস্থাগুলি প্রায় ৩০০টি পাকিস্তানি ড্রোন আটকেছিল। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি ছিল ২৮৭। চলতি বছরের অগস্ট পর্যন্তও প্রায় সমসংখ্যক ড্রোন আটকানো হয়েছে।

এক উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা আধিকারিক বলেন, ‘‘খুব সামান্য প্রস্তুতিতেই যে কোনও জায়গা থেকে, যে কোনও সময় ড্রোন ওড়ানো যায়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাচারকারীদের ড্রোন ওড়াতে সাহায্য করার কাজে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ আমাদের নজরে এসেছে।’’

পাঞ্জাবের এই সীমান্তবেড়া আসলে একাধিক স্তরের একটি স্থলভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা। শান্তির সময় এর পাহারায় থাকে বিএসএফ। তবে নদী এবং বন্যার কারণে কিছু জায়গায় বেড়ার মধ্যে ফাঁক রয়েছে।

বেড়াটি কিন্তু প্রকৃত সীমারেখা বা শূন্যরেখার ঠিক উপরে নেই। পুরনো ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ১৫০ গজ ভিতরে এটি থাকার কথা। কিন্তু বহু অংশে বেড়া তৈরি হয়েছে আরও অনেকটা ভিতরে—কোথাও কোথাও ভারতের দিকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। ফলে বেড়া ও প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমারেখার মাঝখানে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রয়ে গিয়েছে।

১৯৯৩ সালের মধ্যে স্থলসীমান্তের যে অংশগুলিতে কাজ করা সম্ভব ছিল, তার অধিকাংশেই বেড়া ও উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা হয়ে যায়।

আট থেকে বারো ফুট উঁচু এই বেড়ার মাথায় রয়েছে একাধিক সারির ক্ষুরধার কাঁটাতার। কোথাও কোথাও রয়েছে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎবাহী ‘কোবরা’ তারও। বেড়ার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে টহলদারির রাস্তা। জায়গায় জায়গায় রয়েছে নজরমিনার এবং সীমান্তচৌকি।

কিন্তু অনুপ্রবেশ এখন আকাশপথে হওয়ায় এই বেড়া অনেকটাই আধুনিক যুগের ম্যাজিনো লাইনে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের সেই কংক্রিটের প্রতিবন্ধক ও বাঙ্কারে সুরক্ষিত প্রতিরক্ষারেখা শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি, কারণ জার্মান সেনাবাহিনী সেটিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল।

এখন প্রথমবার, ২০২৪ সাল থেকে বিএসএফ ও পাঞ্জাব পুলিশ-সহ একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার হাতে আটক হওয়া ১,২০০টিরও বেশি ড্রোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের যাতায়াতের পথ, উৎক্ষেপণস্থল, মালপত্র ফেলার জায়গা এবং কাজের ধরন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই ড্রোনগুলি দ্রুত আরও উন্নত ও জটিল নিরাপত্তা-হুমকি হয়ে উঠছে।

শুরুতে তুলনামূলক সরল রেডিয়ো-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটত। এখন তা বদলে গিয়েছে প্রযুক্তিগত বাধা মোকাবিলায় অনেক বেশি সক্ষম একটি ব্যবস্থায়। ব্যবহৃত হচ্ছে পরিবর্তিত নকশার ড্রোন, সংকেত বিঘ্নিত করার চেষ্টা প্রতিহত করার ক্ষমতা এবং এমনকি উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।

ভারত ড্রোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা মোতায়েন করলেও বহু ড্রোন এখন নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের চেষ্টা বুঝতে পেরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানে ফিরে যায়। পরে আবার আসে। ফলে পাঞ্জাবের প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর চলছে এক নিরন্তর চোর-পুলিশের লড়াই।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলি পাকিস্তানের পাঞ্জাবে অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ উৎক্ষেপণস্থল চিহ্নিত করেছে, যেখান থেকে নিয়মিত ভারতের দিকে ড্রোন পাঠানো হচ্ছে। পাকিস্তানি পাচারকারীদের ব্যবহৃত প্রধান দুই স্থান হল জাহমান ও মাস্তেকি। আন্তর্জাতিক সীমান্তের পাশে অবস্থিত এই দুই গ্রামের অবস্থান তাদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।

জাহমানের ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে ভারতের পাঞ্জাবের তরন তারন জেলার খালরা সেক্টর। আরও দক্ষিণে মাস্তেকি রয়েছে সেহজরা ভূখণ্ডে—পাকিস্তানের এমন একটি অংশ, যার তিন দিক ঘিরে রয়েছে ভারত। এই অবস্থানের কারণে গ্রামটি মোটামুটি তরন তারনের খেমকরণ শহরের বিপরীতে পড়ে।

অন্য উৎক্ষেপণস্থলগুলির মধ্যে রয়েছে খেমকরণের উল্টো দিকে কাসুরের কাছে কয়েকটি জায়গা; আটারি সেক্টরের রাজাতালের বিপরীতে কিলা জীবন সিংহ; আটারির উল্টো দিকে ওয়াঘা; এবং ভারতের পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ডেরা বাবা নানকের বিপরীতে নারোয়াল।

সূত্রের বক্তব্য, তথ্য বিশ্লেষণ করে ভারতের দিকে ড্রোনের প্রধান গন্তব্যগুলিও চিহ্নিত হয়েছে। এক সূত্র বলেন, ‘‘ড্রোনগুলি সাধারণত ভিন্ডি সৈদাঁ, আটারি, রাজাতাল, ডাল, ডালেরি, মারি মেঘাঁ, ওয়ান এবং খেমকরণের আশপাশের গ্রামে ঢোকে। শেষের এলাকার মধ্যে কলস ও মাস্তগড়ও রয়েছে।’’

অমৃতসরের মাহাওয়া গ্রাম শূন্যরেখা থেকে এক কিলোমিটার দূরে। ফলে বেআইনি ড্রোন অনুপ্রবেশের পথেই পড়ে গ্রামবাসীদের বসতি।

গ্রামের মোট ২,৮০০ একর জমির মধ্যে প্রায় ১৫০ একর রয়েছে শূন্যরেখা ও সীমান্তবেড়ার মাঝখানে।

গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য ও কৃষক সংগঠনের নেতা হরচন্দ সিংহ মাহাওয়া জানান, ড্রোনগুলি প্রায়ই ভারতীয় সীমান্তের ছয় কিলোমিটার ভিতরে চলে আসে। বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ঠিক উপর দিয়েই উড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘‘সম্প্রতি একটি ড্রোন এক কৃষকের জমিতে মালপত্র ফেলে যায়। তিনি আমাদের কাছে আসেন। তাঁর ভয় হচ্ছিল, পুলিশ হয়তো তাঁকেই গ্রেফতার করবে।’’

সাম্প্রতিক নিরাপত্তা-বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ড্রোনগুলি মূলত কৃষিজমিতে মালপত্র ফেলে, যেখান থেকে পাচারচক্রের বাহকেরা তা সংগ্রহ করে। তবে কখনও পথনির্দেশের ভুল বা ভুল জিপিএস তথ্যের কারণে খামারবাড়ি কিংবা বসতবাড়িতেও বোঝা ফেলে যায়।

মাহাওয়ার গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটি পুলিশকে জানায়, যে গ্রামবাসীর জমিতে মালপত্র পড়েছিল, তিনিই প্রথম তাদের খবর দিয়েছেন। হরচন্দ সিংহ মাহাওয়া বলেন, ‘‘পড়ে থাকা ড্রোন বা পিস্তল পেলে বিএসএফ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই কমিটির সদস্য হিসেবে আমাদের কাজ। নিরপরাধ মানুষ যাতে ফেঁসে না যান, সেটাও আমরা দেখি।’’

মাহাওয়ার ওই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত পুলিশ ‘অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের’ বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে।

গিলপন গ্রামের প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য পিশৌরা সিংহের বাড়ির সবজিবাগানে একটি ড্রোন এক কিলোগ্রাম নিষিদ্ধ মাদকের চালান ফেলে গিয়েছিল। তিনি জানান, সেই সন্ধ্যাতেই আর একটি ড্রোন গ্রামের প্রান্তে মালপত্র ফেলে।

‘‘বিএসএফ জায়গাটির অবস্থান জানতে পেরে এলাকা ঘিরতে রওনা হয়েছিল। কিন্তু তারা পৌঁছনোর আগেই কয়েকজন ড্রোন ও মাদক তুলে নিয়ে পালায়। এই ড্রোনগুলির অনেকেই মাদক নিয়ে আসে। এত তরুণের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পিছনে এদের ভূমিকা রয়েছে।’’

শূন্যরেখায় প্রতিদিনের পতাকা নামানোর অনুষ্ঠানের জন্য পরিচিত আটারি। প্রায় ২৫ হাজার মানুষের এই সীমান্তগ্রামেও রোজ নিষিদ্ধ পণ্যবাহী ড্রোনের আনাগোনা চলে। গ্রামের সরপঞ্চ হরপ্রীত সিংহ মাদক ও পাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকার জন্য পরিচিত।

সম্প্রতি তিনি আহত হন। অভিযোগ, মাদক পাচারকারীরাই তাঁর উপর হামলা চালিয়েছিল। সিংহ বলেন, ‘‘গ্রামবাসীরা আমাকে ড্রোনের আনাগোনার খবর দেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, একজন ড্রোন থেকে আসা চালান গ্রহণ করছে। আমরা তাকে ধরে ফেলি। কিন্তু ততক্ষণে সে অন্য কারও হাতে চালান তুলে দিয়েছে। এখানে এ সব নিত্যদিনের ঘটনা।’’

এক উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা আধিকারিক জানান, পাঞ্জাবে পাকিস্তানি ড্রোন প্রথম নজরে পড়তে শুরু করে আনুমানিক ২০১৯ সালে। তখন সেগুলি ছিল তুলনামূলক প্রাথমিক স্তরের। রেডিয়ো তরঙ্গের মাধ্যমে তাদের দিকনির্দেশ নিয়ন্ত্রণ করা হত।

ওই আধিকারিক বলেন, ‘‘২০২৬ সালে পাঞ্জাবে উপগ্রহযোগাযোগ এবং সংকেত বিঘ্নিত করার চেষ্টা প্রতিহত করার ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন চলতে দেখা গিয়েছে। এখন অনেক পাকিস্তানি ড্রোন পথনির্দেশের জন্য স্টারলিঙ্কের উপগ্রহযোগাযোগও ব্যবহার করছে। সেগুলির কয়েকটিকে পাঞ্জাবে নামানোও হয়েছে।’’

পুলিশের দাবি, মাদক পাচারে ব্যবহৃত অধিকাংশ ড্রোন চিনে তৈরি। তার মধ্যে রয়েছে একাধিকবার যাতায়াত করতে সক্ষম ডিজেআই ম্যাভিক ৪ প্রো এবং বেশি ওজনের বোঝা বহন করতে সক্ষম ডিজেআই ম্যাট্রিস ৩০০ আরটিকে।

পাঞ্জাবের আন্তর্জাতিক সীমান্তে বিএসএফ জওয়ানদের হাতে বহনযোগ্য ড্রোন প্রতিরোধের সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। পাঞ্জাব সরকারও বিশেষ গাড়িতে বসানো ভ্রাম্যমাণ ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা কিনেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘বাজ আখ’, অর্থাৎ বাজপাখির চোখ নামের ব্যবস্থাটি।

৫১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার ‘বাজ আখ’ ব্যবস্থা ২০২৫ সালের অগস্টে চালু করেন মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পাচার আটকানো। এর মাধ্যমে দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে পাঞ্জাব দ্বিতীয় প্রতিরক্ষাস্তর হিসাবে নিজস্ব রাজ্যস্তরের ড্রোন প্রতিরোধজাল মোতায়েন করে।

‘বাজ আখ’-এর কাজ হল ড্রোন শনাক্ত করা, গতিবিধি অনুসরণ করা, সংকেত বিঘ্নিত করা এবং সেটিকে নিষ্ক্রিয় করা। সাধারণত রেডিয়ো তরঙ্গ ও জিপিএস সংকেতের কাজে বাধা সৃষ্টি করে এটি। এর কার্যকর পাল্লা আট থেকে দশ কিলোমিটার। স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা দেওয়া এবং মাটিতে থাকা ড্রোনের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র শনাক্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে।

তবে আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, এই ব্যবস্থাগুলির অনেকগুলি প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না। কারণ সংকেত বিঘ্নিত করার পরেও পাকিস্তানি ড্রোন নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

পাঞ্জাব পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, ‘‘পাকিস্তানিরা তাদের ড্রোনে বিপত্তি ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎক্ষেপণস্থলে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা বসিয়েছে। আমাদের ব্যবস্থা যখন সংকেত বিঘ্নিত করা, ড্রোনকে লক্ষ্যবন্দি করা বা নিয়ন্ত্রণ-সংযোগে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন ড্রোন সেই হস্তক্ষেপ বুঝতে পারে। ভারতের দিকে তাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বা উদ্ধার করার আগেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানের উৎক্ষেপণস্থলে ফিরে যায়।’’

আধিকারিকেরা জানান, শনাক্ত করা গেলেও বহু বর্তমান প্রতিরোধব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় বা বাধা সামলে কাজ চালাতে সক্ষম ড্রোনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ড্রোনগুলির কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে রেডিয়ো তরঙ্গ বিঘ্নিত করে তাদের কাবু করা কঠিন।

কখনও ড্রোন অনেক দূরে থাকায় সংকেত বিঘ্নিত করার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

নিরাপত্তা আধিকারিকদের বক্তব্য, আরও বিস্তৃত এলাকায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে অনেক বেশি সংকেত-বিঘ্নকারী যন্ত্র দরকার—অন্তত ১০০টি। সূত্রের খবর, সরকার অতিরিক্ত ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা, হাতে বহনযোগ্য সংকেত-বিঘ্নকারী যন্ত্র এবং গাড়িতে বসানো ব্যবস্থা যুক্ত করে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটি, নজরদারি ক্যামেরা এবং তল্লাশিচৌকির মাধ্যমেও আকাশের গতিবিধির উপর নজর রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এক আধিকারিক বলেন, ‘‘এটি মানুষের সক্রিয় সহায়তায় চলা বহুস্তরীয় ব্যবস্থা। এতে বিএসএফ, পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপকারী দল এবং মাটিতে নেমে উদ্ধারকাজের মধ্যে সমন্বয় দরকার। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর ব্যবস্থা না থাকলে, ড্রোন শনাক্ত করার অর্থ সব সময় তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ক্রিয় করা বা বাজেয়াপ্ত করতে পারা নয়।’’

নিরাপত্তা আধিকারিকদের মতে, অন্য সমস্যাও রয়েছে। ছোট এবং শনাক্ত করা কঠিন এমন ড্রোন প্রায়ই নজর এড়িয়ে যায়। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিকেন্দ্রীভূত যোগাযোগের সাহায্যে বহু ড্রোন একযোগে ঝাঁক বেঁধে আসার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কিছু জায়গায় মালপত্র পড়লেও সেখানে পৌঁছনো কঠিন হয়।

নিরাপত্তা-বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, আটক ড্রোনগুলির প্রতিবারের উড়ানের গড় সময় ছিল ৪৫ মিনিট। পরিবর্তিত নকশার ড্রোনগুলির ক্ষেত্রে এই গড় অনেক কম—প্রায় ২৪ মিনিট।

এক সূত্র জানান, ‘‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নির্দিষ্ট ডিজেআই ম্যাট্রিস ড্রোনের উড়ানের সময় ছিল ৪২.৬৭ মিনিট। অন্য দিকে, একটি ডিজেআই ম্যাট্রিস ৪ প্রো ড্রোনকে নামানোর আগে সেটি ১৫ মিনিট উড়েছিল।’’

ড্রোনগুলির উড়ানের উচ্চতাও আলাদা। ডিজেআই ড্রোনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৫০০ ফুট। পরিবর্তিত নকশার আটটি ঘূর্ণিপাখাযুক্ত ড্রোন, যাকে অক্টোকপ্টারও বলা হয়, তার ক্ষেত্রে উচ্চতা পৌঁছেছে ২,৫০০ ফুট পর্যন্ত।

তথ্যে আরও দেখা গিয়েছে, সাধারণত বৃহস্পতিবার ও শনিবার সবচেয়ে বেশি চালান ফেলা হয়। আটক ড্রোনগুলি পাওয়া গিয়েছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে প্রায় সাড়ে তিন থেকে দশ কিলোমিটার দূরে।

এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ড্রোনের সবচেয়ে বেশি আনাগোনা হয় রাত দশটা থেকে ভোর চারটের মধ্যে। তখন ঘণ্টায় গড়ে ১২ থেকে ১৫টি ড্রোনের তৎপরতা দেখা যায়।’’

তবে গিলপনের পিশৌরা সিংহ জানাচ্ছেন, তিনি বিকেলেও ড্রোন থেকে চালান ফেলতে দেখেছেন।

‘‘সীমান্তের একেবারে গায়েই এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে লোকজন খোলাখুলি দাঁড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছে, মাল ফেলার অপেক্ষা করছে। আমাদের কাছে এর ভিডিয়োও রয়েছে।’’

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

পাঠকের মন্তব্য ০

শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।

এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।