লগইনসদস্যতালেখক
হোম›ভারত›ডাংগাওয়াসে শূন্য বিচার: ৪০ অভিযুক্তই খালাস, প্রশ্ন—‘খুন করল কে?’
ভারত

ডাংগাওয়াসে শূন্য বিচার: ৪০ অভিযুক্তই খালাস, প্রশ্ন—‘খুন করল কে?’

বাংলাস্ফিয়ার: রাজস্থানের নাগৌর জেলার ডাংগাওয়াস গ্রামে ২৪ ঘণ্টাই পাহারায় থাকেন দুই পুলিশকর্মী। ২০১৫ সালের ভয়াবহ জাতিগত সংঘর্ষের পর থেকেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু পুলিশি উপস্থিতি সত্ত্বেও নিহত দলিতদের পরিবার আজ নিজেদের…

ডাংগাওয়াসে শূন্য বিচার: ৪০ অভিযুক্তই খালাস, প্রশ্ন—‘খুন করল কে?’

বাংলাস্ফিয়ার: রাজস্থানের নাগৌর জেলার ডাংগাওয়াস গ্রামে ২৪ ঘণ্টাই পাহারায় থাকেন দুই পুলিশকর্মী। ২০১৫ সালের ভয়াবহ জাতিগত সংঘর্ষের পর থেকেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু পুলিশি উপস্থিতি সত্ত্বেও নিহত দলিতদের পরিবার আজ নিজেদের আগের চেয়েও বেশি অসহায় মনে করছে। মামলার ৪০ অভিযুক্তই আদালতে খালাস হয়ে যাওয়ার পরে তাদের একটিই প্রশ্ন—হত্যা যখন হয়েছে, তা হলে হত্যাকারী কে?

লেখক ও সমাজকর্মী ভঁওয়ার মেঘবংশী ডাংগাওয়াসের ঘটনা নিয়ে বই লিখেছেন। তাঁর কথায়, আদালত মেনে নিয়েছে যে খুন হয়েছে, মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন এবং গণহিংসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কোনও হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা গেল না। তাঁর প্রশ্ন, “তা হলে সেদিন ছ’জনকে হত্যা করল কে?” নিহতদের মধ্যে পাঁচজন দলিত; সংঘর্ষে অন্য পক্ষেরও একজনের মৃত্যু হয়েছিল।

ডাংগাওয়াসের জনসংখ্যার প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ দলিত, আর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জাঠ। আজমের-নাগৌর সড়কের ধারে, মেরতা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত গ্রামটির দলিত মহল্লায় বাবা রামদেবজির একটি মন্দিরই সামাজিক মিলনস্থল। গ্রাম থেকে কিছু দূরে আগাছায় ঢেকে থাকা একটি জমিতে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি ইট। সেখানেই ছিল দলিত পরিবারের তৈরি ঘর ও কুঁড়েঘর, যা ২০১৫ সালের ১৫ মে ট্র্যাক্টর দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনার মূলে প্রায় ২৩ বিঘা জমি। ১৯৬১ সালে রাজস্থান সরকার দলিত কৃষক বস্তা রামকে জমিটি বরাদ্দ করেছিল। বলা হয়, ১৯৬৪ সালে দেড় হাজার টাকা ঋণের বিনিময়ে তিনি জমিটি চিমনারাম জাঠের কাছে বন্ধক রাখেন। চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের সুদ নেওয়া হবে না এবং বস্তা রামও জমির ফসলের ভাগ চাইবেন না।

১৯৯৯ সালে বস্তা রামের দত্তকপুত্র রত্নার নামে জমিটির মালিকানা নথিভুক্ত হয়। জমির দখল ফিরে পেতে রত্না সেখানে একটি ঘর তৈরি করে বসবাসের চেষ্টা করেন। জাঠ পরিবারের দাবি, বস্তা রাম ঋণ শোধ করতে না পারায় জমিটি তাঁদের বিক্রি করেছিলেন। দলিতের জমি অ-দলিতের নামে কেনা আইনত সম্ভব ছিল না বলে ঘিসা রাম নামে আর এক দলিতের নামে বিক্রয় দলিল তৈরি করা হয়। দলিত পরিবার সেই দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে; অন্য পক্ষ রত্নার দত্তক-সংক্রান্ত শংসাপত্রকে জাল বলে দাবি করে।

নিহতদের পরিবারের বক্তব্য, ২০১৫ সালের ঘটনার আগে তাঁদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছিল। ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগেও মামলা হয়েছিল। ১৫ মে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ব্যক্তি ৫০টির মতো মোটরসাইকেল ও তিনটি ট্র্যাক্টর নিয়ে জমিটি ঘিরে ফেলেন বলে আহতদের অভিযোগ। সেখানে ছয় নারী-সহ ১৬ জনকে অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের শরীরের উপর দিয়ে ট্র্যাক্টর চালিয়ে দেওয়া হয়।

নিহত রত্নার ভাই খেমা রাম সেই আক্রমণ থেকে কোনওক্রমে বেঁচে যান। তাঁর দুই ভাই এবং ছেলে গণেশ নিহত হন। খেমার পা ও হাতে এখনও ধাতব দণ্ড বসানো রয়েছে। প্রায় আড়াই বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর কথায়, “আমাদের ঘিরে ধরে মারধর করা হয়েছিল। তারপর ট্র্যাক্টর চালিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে গিয়েছিল।”

রত্না ও পাঁচার স্ত্রী বিদামি দেবী এবং সোনকি দেবীও আক্রান্ত হয়েছিলেন। সোনকির শরীরে এখনও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিদামির প্রশ্ন, “আমাদের পুরুষদের হত্যা করা হল, এখন রায়ও আমাদের বিরুদ্ধে গেল—এটা কী করে সম্ভব?”

ঘটনার পরে তৎকালীন বসুন্ধরা রাজে সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্তদের আইনজীবী মহীপাল চৌধুরীর দাবি, সাক্ষীদের পুলিশ, সিবিআই ও আদালতে দেওয়া বক্তব্যে বহু অসঙ্গতি ছিল। আহতদের প্রথম এক্স-রে ঘটনার পাঁচ দিন পরে করা হয়। কোথাও আক্রমণকারীর সংখ্যা দেড় হাজার, কোথাও ২০০ থেকে ৩০০ বলা হয়েছে। এত বড় ভিড় থেকে নির্দিষ্ট ৪০ জনকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তাঁর দাবি, কয়েকজন অভিযুক্ত ঘটনার দিন গ্রামেই ছিলেন না।

ট্র্যাক্টর দিয়ে পিষে মারার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন চৌধুরী। তাঁর যুক্তি, ট্র্যাক্টর শরীরের উপর দিয়ে গেলে হাড় শুধু ভাঙত না, সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে যেত। দলিত পরিবারগুলির প্রশ্নের জবাবে তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, “নির্দোষ অভিযুক্তেরা চার থেকে নয় বছর জেলে কাটিয়েছেন। তাঁদের সেই বছরগুলি কে ফিরিয়ে দেবে?”

দলিত পক্ষের আইনজীবীরা অবশ্য বলেছেন, গ্রামীণ পরিবেশ, সাক্ষীদের সীমিত শিক্ষা, ঘটনার ভয়াবহতা, তাঁদের বয়স এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত ছিল। সাক্ষ্যে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেই গোটা ঘটনাকে অবিশ্বাসযোগ্য বলা যায় না।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট তদন্ত ও সরকারি কৌঁসুলিদের ভূমিকায় গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ তুলেছেন। বিরোধী দলনেতা টিকা রাম জুলি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। শচীন পাইলটও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গোবিন্দ সিং দোতাসরা এখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।

ডাংগাওয়াসের দলিত পরিবারগুলির অভিযোগ, ২০১৫ সালে জাতীয় স্তরে ক্ষোভ তৈরি হলেও তফসিলি জাতি ও জনজাতি অত্যাচার প্রতিরোধ আইনে নির্ধারিত সাহায্যের বাইরে তাঁরা কিছু পাননি। তাঁদের ১৮টি দাবির মধ্যে শুধু সিবিআই তদন্তের দাবি মানা হয়েছিল। এখন সেই তদন্তের মামলাতেও সবাই খালাস। নিহত এক ব্যক্তির আত্মীয়ের কথায়, “মনে হচ্ছে, আমাদের পরিবারের মানুষগুলিকে আরও একবার হত্যা করা হল।”

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

পাঠকের মন্তব্য ০

শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।

এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।