বাংলাস্ফিয়ার: আশাবাদী হওয়া লাভজনক। যারা ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ, তারা সাধারণত শারীরিক দিক থেকেও বেশি সুস্থ থাকেন। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যালান রোজানস্কি এবং তাঁর সহলেখকদের একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, আশাবাদের সঙ্গে হৃদ্রোগজনিত বিপদের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে। আশাবাদীরা মানসিক দিক থেকেও বেশি দৃঢ় হন। তাঁরা সাধারণত ব্যর্থতা বা বিপর্যয়কে সাময়িক এবং বাইরের পরিস্থিতির ফল বলে মনে করেন। বিপরীতে, নৈরাশ্যবাদীরা ব্যর্থতাকে নিজেদের স্থায়ী দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন।
আশাবাদীরা কর্মক্ষেত্রেও দ্রুত উপরের দিকে ওঠেন। সম্প্রতি মিউনিখ বিজনেস স্কুলের নাদিন চোচোয়েক এবং তাঁর সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্রে নেদারল্যান্ডসের উদ্যোক্তা, কর্তা এবং কর্মীদের উপর সমীক্ষা চালানো হয়। তাতে দেখা যায়, উদ্যোক্তা এবং ম্যানেজারদের আশাবাদের মাত্রা প্রায় সমান। এবং দু’পক্ষই সাধারণ কর্মীদের তুলনায় বেশি আশাবাদী।
কারণ-ফল সম্পর্ক এখানে দুই দিকেই কাজ করে। ক্ষমতা নিজেই আশাবাদের একটি উৎস। ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক হওয়া অনেক সহজ, যদি সেটাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা আপনার থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে কর্মীদের তুলনায় কর্তাদের মনোভাব বেশি ইতিবাচক হওয়ার একটি কারণ নিশ্চয়ই এই যে, কী ঘটবে তার উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বেশি। কিন্তু আশাবাদ মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও দেয়। নৈরাশ্যবাদীদের তুলনায় আশাবাদীরা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রাখেন। সাফল্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে খুব কম প্রত্যাশা এবং ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত—এই দু’টি সাধারণত একসঙ্গে যায় না। নোবেলজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেমান “ভ্রান্ত আশাবাদ”-কে পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি বলে বর্ণনা করেছিলেন।
আত্মবিশ্বাস, তা বাস্তবসম্মত হোক বা না হোক, সংগঠনের মধ্যে বড় পদে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা নেয়। মানুষ আশাবাদী না নৈরাশ্যবাদী, তা মাপার সবচেয়ে প্রচলিত মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাগুলির একটি হল ছোট্ট একটি প্রশ্নমালা, যার নাম “রিভাইজড লাইফ ওরিয়েন্টেশন টেস্ট”। সেখানে এমন বাক্য থাকে—“আমার জীবনে যদি কিছু খারাপ হওয়ার সুযোগ থাকে, তবে সেটাই হবে।” এমন কাউকে কি আপনি অনুসরণ করতে চাইবেন, যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সে অভিশপ্ত?
অবশ্যই আশাবাদ অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছতে পারে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত একটি প্রভাবশালী গবেষণাপত্রে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জু পুরি এবং ডেভিড রবিনসন মানুষের নিজের আয়ু সম্পর্কে প্রত্যাশা এবং অ্যাকচুয়ারিয়াল হিসাবের মধ্যে পার্থক্যকে আশাবাদের মাত্রা মাপার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, অতিরিক্ত আশাবাদীরা মাঝারি আশাবাদীদের তুলনায় ধূমপানের প্রবণতায় বেশি ভোগেন, এবং নিজেদের সম্পদের বড় অংশ অ-তরল সম্পদে আটকে রাখেন। সংগঠনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত আশাবাদ প্রায়ই সমস্যার কারণ হয়। অবাস্তব প্রাথমিক প্রত্যাশা থাকলে প্রকল্পের বাজেট ও সময়সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা বাড়ে। আশাবাদ ব্যর্থ প্রকল্প বন্ধ করার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়; সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা প্রায়ই প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে মূল পরিকল্পনার চেয়ে ভালো ফলের কল্পনা করতে থাকেন।
সবকিছুই অনেকটা নির্ভর করে প্রেক্ষাপটের উপর। “আচ্ছা, আর কী-ই বা খারাপ হতে পারে?”—এই বাক্যটি একজন পডকাস্টারের মুখে যতটা স্বাভাবিক শোনায়, একজন পাইলটের মুখে ততটাই উদ্বেগজনক। ক্যালাব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দামিয়ানো সিলিপো এবং তাঁর সহলেখকদের একটি গবেষণায় আমেরিকার ব্যাঙ্কগুলির আশাবাদের মাত্রা মাপা হয়েছিল, ভবিষ্যতের ঋণখেলাপির ক্ষতি সামলাতে তারা কত টাকা সংরক্ষণ করছে তা দেখে। ২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সঙ্কটের আগে ব্যাঙ্কারদের মধ্যে আশাবাদই ছিল প্রধান সুর। তারপর হঠাৎ করেই আর তা রইল না।
আশাবাদজনিত পক্ষপাত কাটানোর নানা উপায় রয়েছে। প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থাও সাহায্য করতে পারে, যেমন “প্রি-মর্টেম” পদ্ধতিতে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে ধরে নেয় যে কোনও উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে, এবং তারপর সেই ব্যর্থতার সম্ভাব্য কারণগুলো খুঁজে বের করে। দলের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের উলরিকে মালমেন্ডিয়ের এবং তাঁর সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, কোনও প্রতিষ্ঠানের সিএফও যদি অতিরিক্ত আশাবাদী হন, তবে তা ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পূর্বাভাস দিতে সিইও-র আত্মবিশ্বাসের থেকেও বেশি কার্যকর। তবে একই গবেষণায় আরও দেখা যায়, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী সিইও-রা সাধারণত অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী সিএফও-দেরই নিয়োগ করেন। যদি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাই আশাবাদী হয়, তাহলে সমস্যা তৈরি হবেই।
তবে উল্টো দিকেও অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহৎ আর্থিক পরিষেবা সংস্থা ডিসকভারি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাড্রিয়ান গোর তাঁর নতুন বই দ্যা ফোর প্রিন্সিপ্যালস্ – এ লিখেছেন, ব্যবসার জগতে গভীরভাবে প্রোথিত নৈরাশ্যবাদ একটি বড় সমস্যা।
মানুষকে সবসময় নেতিবাচক সংকেত খুঁজতে শেখানো হয় এমনটাই মনে করেন মিস্টার গোর। কেন কোনও কাজ খারাপ হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করাকে সাধারণত এই বিশ্বাসের চেয়ে বেশি পরিণত বা বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে করা হয় যে শেষ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক হবে। “লস অ্যাভারশন” বা যা আছে তা হারানোর ভয় মানুষের আচরণের একটি প্রবল পক্ষপাত যা ঝুঁকি নেওয়ার বিরুদ্ধে পাল্লাকে আগেই ভারী করে রাখে। মিস্টার গোরের মতে, “ব্যর্থতা থেকে শেখা” কথাটি অতিরিক্ত ব্যবহার করা হয়; সাফল্য মানুষকে আরও বেশি শেখায়। কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে মানুষের দুর্বলতা শুধরে দেওয়ার চেয়ে তাদের শক্তির জায়গার সঙ্গে মানানসই ভূমিকায় বসানোয় জোর দেওয়া উচিত।
নৈরাশ্যেরও প্রয়োজন আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যায় আশাবাদই।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।